কার হাতে নবান্ন ?

SIR আর “অভয়া” আদৌ কি কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে পানিহাটীতে ?

২০২৬এর ভোটের আগে দাঁড়িয়ে আলোচনার অভিমুখ নির্মল ঘোষের উত্তরসূরী তীর্থঙ্কর ঘোষ, অন্য দিকে গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের উত্তরসূরী কলতান দাশগুপ্তর দিকেই। সেক্ষেত্রে প্রার্থী নির্বাচনে বিজেপি যদি কোন চমক আনতে পারে, আর সিপিআইএমের ভোট আবার পদ্মফুলেই যায়, তাহলে দ্রোহের পিতাকে হয়ত খালি হাতেই ফিরতে হবে পানিহাটী থেকে।

চন্দন সেনগুপ্ত : “কার হাতে নবান্ন ?” শীর্ষক প্রতিবেদনে আমরা চেষ্টা করবো এক একটি বিধানসভা ধরে বিশ্লেষণ করার। প্রথমেই বলা ভালো, ২০২৬এর অষ্টাদশ বিধানসভা নির্বাচন এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে হতে চলেছে আগামী ২৩ ও ২৯শে এপ্রিল। SIR এর ধাক্কায় পানিহাটীতে মোট ভোটারের সংখ্যা কমেছে অনেকটাই। ২০২১’র বিধানসভা নির্বাচনে এ আসনে মোট ভোটার ছিলেন ১লক্ষ ৮৫হাজার ৮৯৭জন। SIR এর পরে সেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে কম-বেশী ১লক্ষ ৫০হাজারের কাছাকাছি। এই বিপুল সংখ্যক ভোটার বাদ যাবার পর পানিহাটীর ভোটের মানচিত্রটা খানিক বদলাতেই পারে, কিন্তু কোন দিকে ? এটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। যে অভয়া কান্ডকে কার্যত হিমঘরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল, হটাৎ করে অভয়ার বাবা, মা ভোটে বিজেপির প্রার্থী হবার ইচ্ছে প্রকাশ করে, ২০২৪ সালের ৯ই আগস্টের সেই ঘটনাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছেন। আর ১ম দিন থেকেই অভয়া কাণ্ডে মুখর ছিলেন যারা, তাদেরই একজন কলতান দাশগুপ্ত এবার পানিহাটীতে সিপিআইএম প্রার্থী। আবার অভয়া কাণ্ডে মৃতদেহ তাড়াহুড়ো করে দাহ করে দেবার অভিযোগ উঠেছিল পানিহাটীর বিদায়ী বিধায়ক ও বর্তমান পৌরপ্রধানের বিরুদ্ধে। শুরু থেকেই অভয়া আন্দোলনের মুখ যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে কোনো বিজেপি নেতার নাম মনে করতে পারছেন না পানিহাটীর ভোটারেরা, সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে অভয়া কান্ড মাথাচাড়া দেবার ফলে একটু সুবিধা কি পেয়ে যেতে পারেন কলতান ? আবার উল্টো দিকে এই অভয়া কাণ্ডে যার নাম জড়িয়ে ছিল সেই নির্মল ঘোষ এবার আর তৃণমূলের ভোট প্রার্থী নন তীর্থঙ্কর ঘোষের নাম অভয়া কাণ্ডের কোন অংশেই উঠে আসে নি, যেমন এসেছিলো বর্তমান পৌরপ্রধান বা অভয়ার এক প্রতিবেশী কাকুর নাম। সেই দিক থেকে তৃণমূলের এই প্রার্থী বদল, পানিহাটীতে “মাস্টার স্ট্রোক”। এই প্রতিবেদন লেখা অবধি বিজেপি প্রার্থীর নাম ঘোষণা হয় নি।যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেয়া যায় অভয়ার পরিবার থেকেই বিজেপি তাদের প্রার্থী দেবে, পানিহাটীর আনাচে কানাচে ঘুরে এমনটা কখনোই মনে হয় নি “অভয়া কাণ্ডের” নিরিখে কেউ বিজেপিকে ভোট দেবেন, বিজেপির অন্য কোন প্রার্থী হলে যে ভোট তারা পেতেন, অভয়ার পরিবারের পক্ষে সেই ভোট ধরে রাখা বোধহয় সম্ভব হবে না।

পানিহাটীতে বিজেপির প্রকৃত ভোট কত ? : এ প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে ২০১১ সালে পনিহাটিতে বিজেপি ভোট ছিল ২.৪৮শতাংশ, ২০১৬তে বিজেপি এ আসনে সরাসরি তৃণমূলের ভোটবাক্সে থাবা বসিয়েছিলো। ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ৯.০৬ শতাংশ। তারপর ২০২১, বামেদের ভোট কেটে বিজেপি পানিহাটীতে পরিণত হয় ২য় শক্তিতে, ৩৫.১৭ শতাংশ ভোট পেয়ে।

কিন্তু অভয়া কান্ডকে সামনে রেখে যদি বিজেপি চলতি ভোট মানুষের দরজায় যায়, জানা নেই তার পরিণতির ইতিবাচকতা অথবা নেতিবাচকতা। ঐতিহাসিক ভাবে পানিহাটী ২টি ভাগে বিভক্ত। অতীতে কংগ্রেস-সিপিআইএম, আর বর্তমানে তৃণমূল-সিপিআইএম। সিপিআইএমের নেতিবাচক ভোট পেয়ে বর্তমানে ২য় স্থানে বিজেপি, কিন্তু প্রশ্ন, বিজেপি কি আদৌ তার নিজস্ব ভোট ব্যাঙ্ক তৈরী করতে পেরেছে ? উত্তর হলো, তার প্রমান ২০২৪এর লোকসভা নির্বাচনেও পাওয়া যায় নি। তাই ২০২৬এর ভোটার আগে দাঁড়িয়ে আলোচনার অভিমুখ নির্মল ঘোষের উত্তরসূরী তীর্থঙ্কর ঘোষ, অন্য দিকে গোপালকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের উত্তরসূরী কলতান দাশগুপ্তর দিকেই। সেক্ষেত্রে প্রার্থী নির্বাচনে বিজেপি যদি কোন চমক আনতে পারে, আর সিপিআইএমের ভোট আবার পদ্মফুলেই যায়, তাহলে দ্রোহের পিতাকে হয়ত খালি হাতেই ফিরতে হবে পানিহাটী থেকে। একদিকে ধর্ম,জাতপাত, অন্য দিকে ভাত, কাপড় আর আশ্রয়ের লড়াইয়ে পানিহাটীর ভোটারেরা কোন দিকে থাকে, সেটা জানার জন্য আমাদের আগামী ৪ঠা মে পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।

২০১১ সালের নির্বাচনে পানিহাটীর ফলাফল :
১) নির্মল ঘোষ (তৃণমূল কংগ্রেস) : ৮৮.৩৩৪ শতাংশের হিসেবে ৫৮.৩৪
২) অহিভূষণ চক্রবর্তী (সিপিআইএম) : ৫৬.৯০২ শতাংশের হিসেবে ৩৪.৫৮
৩) কিশোর কুমার সাউ : (বিজেপি) ৩.৭৫৯ শতাংশের হিসেবে ২.৪৮

২০১৬ সালের নির্বাচনে পানিহাটীর ফলাফল :
১) নির্মল ঘোষ (তৃণমূল কংগ্রেস) : ৭৩.৫৪৫ শতাংশের হিসেবে ৪৪.৭
২) সন্ময় বন্দোপাধ্যায় (জোট) : ৭০.৫১৫ শতাংশের হিসেবে ৪২.৮৬
৩) দীপক কুমার কুন্ডু (বিজেপি) : ১৪.৯০৫ শতাংশের হিসেবে ৯.০৬

২০২১ সালের নির্বাচনে পানিহাটীর ফলাফল :
১) নির্মল ঘোষ (তৃণমূল কংগ্রেস) : ৮৬.৪৯৫ শতাংশের হিসেবে ৪৯.৬১
২) সন্ময় বন্দোপাধ্যায় (বিজেপি) : ৬১.৩১৮ শতাংশের হিসেবে ৩৫.১৭
৩) তাপস মজুমদার (জোট) ২১.১৬৯ শতাংশের হিসেবে ১২.১৪

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে পানিহাটীর ফলাফলঃ
১) তৃণমূল কংগ্রেস : ৭১.৯০৯ শতাংশের হিসেবে ৪১.৮৬
২) বিজেপি : ৫৯.৪৭৪ শতাংশের হিসেবে ৩৪.৬২
৩) সিপিআইএম : ৩৫.৮৪৯ শতাংশের হিসেবে ২০.৮৭

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *