সম্পাদকীয়

বাহুবলী অধ্যুষিত “বরানগর”, নিস্কন্টক নয় কোনও ফুল, কতটা প্রস্তুত জ্যোতিবাবুর উত্তরসূরিরা ?

চন্দন সেনগুপ্ত : ২০২৬এর বিধানসভা নির্বাচনে কলকাতার উপকণ্ঠে বরানগর বিধানসভা আসনটি যে এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে চলেছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণটা অদ্ভুতভাবে সব দলের ক্ষেত্রেই এক। স্থানীয় প্রার্থী চাই, কারণ ইতিহাস ঘেঁটে পাওয়া তথ্য বলছে সেই ১৯৫১সালে ১ম বিধানসভা নির্বাচন থেকে গত ২০২৪এ উপ নির্বাচন, সব ক্ষেত্রেই বিজয়ী প্রার্থীরা বহিরাগত, সে জ্যোতি বসুই হন বা আজকের সায়ন্তিকা ব্যানার্জী। ১৯৫১ থেকে ২০১১ টানা ১৪টি নির্বাচনে বরানগর জয়ী করেছে বামপন্থীদের, যদিও ১৯৭২সালে সিপিআই ছিলো জাতীয় কংগ্রেসের দোসর। জ্যোতি বসু পরাস্ত হয়েছিলেন। ১৪বারের মধ্যে ৭বার এখানে জয়ী হয়েছিল সিপিআইএম, আর পরবর্তী বামফ্রন্ট আমলে আরএসপি। এরমধ্যে ২০০১এর ভোট বাম প্রার্থী, আরএসপি`র অমর চৌধুরী তৃণমূল প্রার্থীকে পরাস্ত করছিলেন মাত্র ২,৫৪১ভোট, যেখানে বিজেপি প্রার্থী হেমেন গুহরায় পেয়েছিলেন ৬,০০০ভোট. যে ভোট তৃণমূল প্রার্থী অতীন ঘোষ পেলে ২০০১ সালেই বরানগরের বাম দূর্গে ফাটল ধরতে পারতো। যে ফাটল তৈরী হলো উত্তর কলকাতার দাপুটে তৃণমূল নেতা তাপস রায়ের হাত ধরে ২০১১সালে। তবে উল্লেখ করতেই হয়, যে ১৪টি নির্বাচনে বরানগর বামেদের পক্ষে রায় দিয়েছিলো, তার মধ্যে জ্যোতি বসু কোনদিন ৫২ শতাংশের কম ভোট পান নি, কিন্তু ২০১১ থেকে তৃণমূলের জয়ে কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে উল্লেখযোগ্য ওঠাপড়া। যেমন ২০১১র ঐতিহাসিক নির্বাচনে তৃণমূলের তাপস রায় আরএসপি প্রার্থী সুকুমার ঘোষকে পরাস্ত করেছিলেন ৩৬,৮২৮ভোটে। আবার সেই তাপস রায়ই ২০১৬সালে জিতলেন মাত্র ১৬.১০০ভোটে , যার মানে ৫ বছরে তৃণমূলের ভোট কমে গেলো ২০.৭২৮টি, শতাংশের হিসেবে ১১.৭৯%। ২০২১, ইতিমধ্যে বাংলার রাজনীতিতে উত্থান ঘটেছে বিজেপির, সেই ভোটে বামেরা বরানগর আসনটি ছেড়ে দেয় জাতীয় কংগ্রেসকে, ২২.৪৬ শতাংশ ভোট হারিয়ে বাম কংগ্রেস জোট ৩য় স্থানে চলে যায়, বিজেপির অভিনেত্রী প্রার্থী পার্নো মিত্র ২২.৪৬ শতাংশ ভোট বাড়িয়ে উঠে আসেন ২য় স্থানে, আর তৃণমূলের ভোট বাড়ে ৪.৬৩শতাংশ। তাপস রায় জয়ী হন ৩৫.১৪৭ ভোটে , যেটা ২০১৬র থেকে ১৯.০৪৭ ভোট বেশী। এরপর তৃণমূলের আসর থেকে তাপস রায়ের বিদায়, ২০২৬এ লোকসভার সাথেই বিধানসভার উপ নির্বাচন হয় বরানগরে, তাপস রায়ের ছেড়ে যাওয়া আসনে তৃণমূল প্রার্থী করে ২০২১এর নির্বাচনে বাঁকুড়া আসনে পরাস্ত প্রার্থী, অভিনেত্রী সায়ন্তিকা ব্যানার্জীকে। সাধারণতঃ উপ নির্বাচনে সাধারণ নির্বাচনের থেকে ফল ভালো হয় শাসক দলের, কিন্তু সেই মিথ ভেঙে সায়ন্তিকা ব্যানার্জীর ভোট ১০.৩৮শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৬৯.২৫১তে, উল্টো দিকে বিজেপির উত্তর কলকাতার নেতা, কলকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলর সজল ঘোষ বিজেপি প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে ৬.৯১শতাংশ ভোট বাড়িয়ে নেন, আর দীর্ঘ দিন বাদে এ আসনে সিপিআইএম প্রার্থী করে স্থানীয় সিপিআইএম নেতা তন্ময় ভট্টাচার্যকে। ২০২৪এর উপ নির্বাচনে সিপিআইএমের ভোটও বৃদ্ধি পায় ৪.০৬শতাংশ। তৃণমূল প্রার্থী সায়ন্তিকা ব্যানার্জী জয়ী হন মাত্র ৮.১৪৮ভোটে , যা ২০২১এর থেকে ২৬.৯৯৯ভোট কম। এই হিসেবের উপর দাঁড়িয়ে হতে চলেছে ২০২৬এর বিধানসভা নির্বাচন। শাসক দল হিসেবে এডভ্যান্টেজ তৃণমূল হলেও, দলের ভিতরের কোন্দল প্রকাশ্যে চলে আসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে দলীয় বাহুবলী নেতাদের কার্যকলাপ এখন মিডিয়া সহ স্থানীয় ভোটারদের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাউন্সিলর কেন্দ্রিকতায় দলে বেড়েছে গোষ্ঠী, আর সেই সুযোগ নিচ্ছে অনাহুত কিছু দুষ্কৃতী। বিধায়কের থেকে বাহুবলি নেতাদের দর নাকি বরানগরের বাজারে বেশী। পাশাপাশি কলকাতা লাগোয়া হবার সুযোগে জমি মাফিয়াদের দাপট কাকে বলে, সেটাও নাকি টের পাচ্ছে আপামর বরানগরবাসী। পাশাপাশি উঠে আসছে স্থানীয় প্রার্থীর দাবী। যদিও সেটা কোন নেতাই প্রকাশ্যে স্বীকার করতে রাজী নন। উল্টো দিকে সজল ঘোষ, দল আবার তাকে টিকিট দেবে ধরে নিয়ে নেমে পড়েছেন ভোট বাজারে। স্থানীয় ইস্যু নিয়ে তিনি পথে নামছেন রোজ। পানীয় জল, রাস্তা এবং নিকাশী, ব্যারাকপুরের অন্য পৌরসভাগুলির থেকে সমস্যার কোন কমতি নেই বরানগরে। সাথে রয়েছে বাহুবলি নেতাদের বিরুদ্ধে প্রচার। বামেরা এ আসনটি নিয়ে কি ভাবছে সেটা প্রকাশ্যে না এলেও, গত উপ নির্বাচনে ভোটের হার বাড়ায় তারাও উৎসাহী, বেড়েছে সাংগঠনিক শক্তিও। সব মিলিয়ে ২০২৬এ বরানগরে তৃণমূল এগিয়ে শুরু করবে তা ঠিক, কিন্তু পাশার চাল একটু এদিক ওদিক হলে পাশা ওল্টাতেও সময় লাগবে না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *