সম্পাদকীয়

নির্বাচনী ‘প্রতিশ্রুতি’ নয় ‘প্রতিজ্ঞা’, শব্দচয়নের বদলে কি সাধারণের মন বদলের চেষ্টা তৃণমূলের ?

রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান কি নিতান্তই প্রতিশ্রুতির বদলে 'প্রতিজ্ঞা' শব্দটি ব্যবহার করলেন? নাকি এর পিছনে থাকতে পারে অন্য কারণ ?বাংলা অভিধান অনুযায়ী প্রতিশ্রুতির তুলনায় প্রতিজ্ঞা শব্দের অভিঘাত অনেক বেশী। আর তৃণমূলের '১০ প্রতিজ্ঞা' যে আগামী দিনে ভোটের ময়দানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চলেছে তা বলাই বাহুল্য।

আদৃতা মজুমদার : নির্বাচনী ইস্তেহার বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ( Election Manifesto) এই শব্দবন্ধগুলির সাথে কমবেশি আমরা সকলেই পরিচিত। ভোটের আগে সাধারণত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের ইস্তেহার প্রকাশ করে। সোজা ভাষায় বললে, তাদের দল ক্ষমতায় এলে কোন কোন দিকে তাঁরা উন্নয়ন করবেন তারই একটা রূপরেখা দেওয়া হয় এই ইস্তেহারের মাধ্যমে। আর এই প্রতিশ্রুতির ডানায় ভর করে ভোটে জিতেও আসে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল। কোনো প্রতিশ্রুতি পূরণ হয় আবার কখনো প্রতিশ্রুতি শুধুমাত্র খাতায় কলমে থেকে যায় বলেও অভিযোগ ওঠে। তবে এবার আর প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিজ্ঞা করলো রাজ্যের শাসক দল(TMC)। আজ নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে নিজেদের ‘১০ প্রতিজ্ঞা’ প্রকাশ করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়(Mamata Banerjee)। এখন প্রশ্ন হলো রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান কি নিতান্তই প্রতিশ্রুতির বদলে ‘প্রতিজ্ঞা’ শব্দটি ব্যবহার করলেন? নাকি এর পিছনে থাকতে পারে অন্য কারণ ?

বাংলা অভিধান অনুযায়ী প্রতিশ্রুতির তুলনায় প্রতিজ্ঞা শব্দের অভিঘাত অনেক বেশী। আর তাই আবারো তৃণমূল ক্ষমতায় এলে তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে থাকা ১০ প্রতিজ্ঞা পূরণ হবেই। কারণ প্রতিশ্রুতি শব্দের সঙ্গে যতটা দায়বদ্ধতা আছে প্রতিজ্ঞা শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই দায়বদ্ধতার পরিমাণ অনেকটাই। প্রতিজ্ঞা তো সর্বদাই যথাযথভাবে পূরণ হবার দাবি রাখে। সাধারণের মনে কি তবে এই ধারণাই দিতে চাইলেন মুখ্যমন্ত্রী? উত্তর আমাদের অজানা। তবে সুপরিকল্পিতভাবে যে শব্দ চয়ন করা তা সহজেই অনুমেয়। এবার আসা যাক ১০ টি প্রতিজ্ঞার বিষয়ে। স্বাস্থ্য থেকে শিল্প সব ক্ষেত্রকেই ছোঁয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এই ইস্তেহারে। রাজ্যের মহিলাদের সুবিধার্থে তাদের মাসিক ভাতা দেওয়ার প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার (Lakshmir Bhandar)’ চালু করেছে সরকার। আর সেই প্রকল্প সারাজীবন চলবে – এমনটাই জানালেন মমতা। সেই সঙ্গে অব্যাহত থাকবে পশ্চিমবঙ্গের জীবিকাহীন যুবক-যুবতীদের জন্য সদ্য চালু হওয়া প্রকল্প “যুবসাথী (Yubasathi)।” কৃষকদের কথা মাথায় রেখে ৩০ হাজার কোটি টাকার পৃথক কৃষি বাজেটের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে মমতা জানান আবাস যোজনা প্রকল্পের মাধ্যমে আপাতত ১ কোটি ২০ লক্ষ পাকা বাড়ি তৈরী করে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে বাকী থাকা কাঁচা বাড়িগুলিকেও পাকা পোক্ত রূপ দেওয়া হবে। সবমিলিয়ে প্রত্যেকের কাঁচা বাড়ি পাকা করে দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে ঘাসফুল শিবিরের তরফে। নির্বাচনে জেতার পর বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে পরিশ্রুত পানীয় জল সরবরাহ করার প্রতিজ্ঞা নিয়েছে বর্তমান বিদায়ী সরকার। উল্লেখ্যযোগ্যভাবে শিক্ষা এবং শিল্পতেও নয়া উদ্যোগ নেবার পরিকল্পনা রয়েছে শাসক শিবিরের। দুয়ারে সরকার কর্মসূচির মাধ্যমে যেমন বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে পারেন সাধারণ মানুষ তেমন এবার সেই ধাঁচে ‘দুয়ারে স্বাস্থ্য’ র অঙ্গীকার নিয়েছে তৃণমূল সরকার। রাজ্যের প্রতিটি ব্লক ও টাউনে ফি বছর এই স্বাস্থ্য শিবির করার ভাবনা রয়েছে তাদের। এমনকি ভোটে জিতলে রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলির পরিকাঠামো উন্নত করার প্রতিজ্ঞা নেওয়া হয়েছে বিদায়ী সরকারের তরফে। এদিন মমতা বললেন “বাণিজ্যের কান্ডারি, বাংলাই দিশারি।” বাংলাকে বাণিজ্যের দিক থেকেও সমৃদ্ধ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। প্রবীণদের পাশে থাকার আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে বিদায়ী শাসক শিবিরের ইস্তেহারে। এমনকি আগামীতে তৃণমূল সরকার এলে নতুন ৭ টি জেলা তৈরী ও পুরসভার সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে তাদের ম্যানিফেস্টোতে।

এদিন শুধুমাত্র ইস্তেহার প্রকাশ নয়, দেওয়া হয়েছে উন্নয়নের খতিয়ানও। তাই নির্বাচনের আগে একাধিক প্রকল্প যেমন হয়ে উঠছিলো তৃণমূল প্রার্থীদের প্রচারের অস্ত্র তেমনি এদিন তাদের ‘১০ প্রতিজ্ঞা’ যে আগামী দিনে ভোটের ময়দানে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে চলেছে তা বলাই বাহুল্য। তবে দিনশেষে আবারো মাথায় আসে ‘প্রতিজ্ঞা’ র কথা। প্রতিশ্রুতি নয়। শব্দচয়নের বদল ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলবে তো ? উত্তর লুকিয়ে সময়ের গর্ভে।

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *