রাজনীতিতে “নীতি-আদর্শ” – এবং প্রতীক উর
সিপিআইএমের নতুন প্রজন্মের নেতা প্রতীক উর রহমানের ধন্যবাদ পাওয়া উচিত, অন্তত ক`য়েক দিনের জন্য রাজনৈতিক নীতি, আদর্শ ইত্যাদি শব্দগুলিকে আলোচনার মাঝে নিয়ে আসার জন্য। বাংলার মানুষ যে এখনও সিপিআইমকে একটি আদর্শবাদী দল হিসেবে গণ্য করে বা মর্যাদা দেয়, সেটা সেলিম সাহেবেরা কি ক`য়েক দিন আগেও বিন্দুমাত্র অবহিত ছিলেন এমন প্রবল ভাবে ?
চন্দন সেনগুপ্ত : শুধু বাংলা নয়, সারা দেশ জুড়ে যখন রাজনীতিতে “নীতি-আদর্শ” ইত্যাদি বিষয়গুলি প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গেছে, সামনের সারিতে জায়গা করে নিয়েছে ধর্ম,সাম্পদায়িকতা,হিংসা,দুর্নীতি ইত্যাদি শব্দবন্ধ গুলি, ঠিক সে সময়ে দাঁড়িয়ে সিপিআইএমের (CPIM) নতুন প্রজন্মের নেতা প্রতীক উর রহমানের ধন্যবাদ পাওয়া উচিত, অন্তত ক`য়েক দিনের জন্য রাজনৈতিক নীতি, আদর্শ ইত্যাদি শব্দগুলিকে আলোচনার মাঝে নিয়ে আসার জন্য।
বাংলার মানুষ যে এখনও সিপিআইমকে একটি আদর্শবাদী দল হিসেবে গণ্য করে বা মর্যাদা দেয়, সেটা সেলিম (Md Salim) সাহেবেরা কি ক`য়েক দিন আগেও বিন্দুমাত্র অবহিত ছিলেন এমন প্রবল ভাবে ? আলিমুদ্দিন শেষ কবে মিডিয়ার পর্দায় এতটা ফুটেজ পেয়েছেন, মনে করতে পারছেন ? বিগত প্রায় ১ দশক ধরে রাজ্য জুড়ে যে “তৃণমূল-বিজেপি” বাইনারি তৈরী হয়েছে, সিপিআইএমের (CPIM) নেতাদেরই তো অভিযোগ, সবটাই মিডিয়ার কারসাজি। কিন্তু সেই তথাকথিত “কারসাজির” পাল্লায় পড়ে বাংলার সংসদীয় রাজনীতিতে যে সিপিআইএম আজ “শূন্য” এই অপ্রিয় সত্যটাকে তো মানতে হবে। সেই শূন্য হয়ে যাওয়া দলটি যে বাংলার মাটিতে আজও সাংঘাতিক রকম প্রাসঙ্গিক, সেটা প্রমাণই হতো না, যদি না হঠাৎ করে প্রতীক উর (Pratik Ur Rahaman) বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন। তবে প্রতীক উর এর এই বিদ্রোহ কি শুধুমাত্র আবেগের বহিঃপ্রকাশ ? মনে তো হয় না, কারন প্রতীক উর এর নেতা জ্যোতি বসুর একটি কথা এখানে খুব প্রাসঙ্গিক, তিনি সর্বদা বলতেন “রাজনীতিতে আবেগের কোন জায়গা নেই।” সিপিআইএম দলে প্রতীক উরই যে প্রথম বিদ্রোহী, এমনটা মনে করেন না পাড়ার চায়ের দোকানের পাঁচুদাও, কারন এর আগে অজস্র উদাহরণ আছে, নেপালদেব ভট্টাচার্য থেকে প্রসেনজিৎ বসু, নামের তালিকা দীর্ঘ করাই যায়, তাতে আলোচনা দিক্ভ্রান্ত হতে পারে, কিন্তু প্রতীক উর এর সাথে অন্যান্য অনেকের পার্থক্য অনেকটা, কারণ তারা কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেই, অন্য দলের প্রশংসায় মুখর হন নি। গত ৭দিন আগে পর্যন্তও প্রতীক উর এর গলায় ছিলো তৃণমূল ও বিজেপির প্রতি আদর্শগত ক্ষোভ, লড়াই ছিলো তাদের রাজনৈতিক মত ও পথ নিয়েও। যে প্রতীক উরকে মৃতপ্রায় করে রেললাইনে ফেলে রাখা হয়েছিল, যেখান থেকে তিনি বেঁচে ফিরেছিলেন ফিনিক্স পাখির মতো, সেখান থেকে সরাসরি শুধুমাত্র মার্ক্সবাদের প্রতি প্রাণপাত আনুগত্য থেকে, নওশাদ সিদ্দিকীর ( Naushad Siddiqui) পালিয়ে যাওয়া আসন থেকে মহা বলবান অভিষেক ব্যানার্জীর( Abhishek Banerjee)বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করা, ইতিহাসে কিন্তু এই কথাগুলিও লেখা থাকবে।
তবে শূন্যতা কাটানোর নির্বাচনের ঠিক আগে প্রতীক উর এর এই বিদ্রোহ, অনেকটাই “স্ক্রিপ্টেড” লাগছে। যদি সিপিআইএম ঠিক মতো চালিয়ে খেলতে পারে, রাজনীতির সামান্য ছাত্র হিসেবে বলা যায়, প্রতীক উর অনেকটা সুবিধা করে দিলো দলের, কারণ ১-২ করে যদি এ প্রশ্নগুলি তোলা হয় যে, কে বা কারা রাজ্য সম্পাদককে লেখা তার পদত্যাগ পত্রটি প্রকাশ্যে আনলেন, সেটার তদন্ত হোক, মুখোমুখি হবেন তো প্রতীক উর সেই তদন্তের সামনে ? রাজ্য সম্পাদক বা তার সহ কর্মী কমরেডদের বিরুদ্ধে তিনি যে টানা অভিযোগ করে যাচ্ছেন, অন্য দলে যোগ দিলে কিন্তু সেই অভিযোগের অসারতাই প্রমান পাবে, প্রতীক উরের করা অভিযোগের নয়। প্রতিকুরের পথ যদি এখন ঋতব্রত ব্যানার্জীর (Ritabrata Banerjee)পথেই হয়, তাহলে ২০২৬এর বিধানসভায় সিপিআইএম শূন্য থাকতেই পারে,কিন্তু প্রতিকুর শূন্য থাকবেন না, এটা জেনেই হয়তো শূন্য থেকে মহাশূন্যের দিকে পা বাড়াচ্ছেন তিনি। হয়ত বিধায়ক হবেন, সংসদও হতে পারেন। কিন্তু মৃতপ্রায় করে রেললাইনে ফেলে রাখা যে প্রতিকুর ফিরে এসেছিলেন ফিনিক্স পাখির মতো, সেই প্রতিকুরকে আর পাবে না বাংলার মানুষ। চিত্রনাট্যের যবনিকা পড়ে যাবে সেখানেই।
(প্রকাশিত লেখাটির বক্তব্য লেখকের নিজস্ব )


