‘জন অরণ্যে’ শূন্যতা, না ফেরার দেশে সাহিত্যিক শংকর
বেশকিছু বছর ধরেই তিনি ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ভুগছিলেন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায়ও। আজ দুপুরে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে,সাহিত্যিকের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাঙালি পাঠক, সাহিত্যিকমহল।
বাংলা সাহিত্যজগতে এক যুগের অবসান, না ফেরার দেশে সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় (Manishankar Mukherjee) । সাধারণ মানুষ থেকে সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘শংকর’ নামেই। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। বেশকিছু বছর ধরেই তিনি ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ভুগছিলেন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায়ও। সপ্তাহ ২ আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে একটি বাইপাসের ধারে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তখন থেকেই খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন তিনি, ক্রমশই অবস্থার অবনতি হচ্ছিলো। আজ দুপুরে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে,সাহিত্যিকের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ বাঙালি পাঠক, সাহিত্যিকমহল।
কালজয়ী সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় তার সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন ১৯৫৫ সালে। মাত্র ২২ বছর বয়সে সৃষ্টি করেছিলেন ‘কত অজানারে’, এই বাংলা উপন্যাস বাঙালি সাহিত্যপ্রেমীদের মনে অল্প সময়েই জায়গা করে নিয়েছিল। এরপর একের পর এক কালজয়ী উপন্যাস তিনি উপহার দিয়েছেন বাঙালি পাঠক , সাহিত্যপ্রেমীদের। ‘চৌরঙ্গী’ , ‘জন অরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’ এর মতো উপন্যাস শংকরকে খ্যাতি এনে দেয়। বলা বাহুল্য, খ্যাতি ও জনপ্রিয়তার নিরিখে ‘চৌরঙ্গী’ আজও এক মাইলফলক, বাংলা ভাষার গন্ডি ছাড়িয়ে শংকরের এই সৃষ্টি অনুবাদ হয়েছিল আরও বেশ কয়েকটি ভাষায়।ভাষার সীমানা পেরিয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি। এই মুহূর্তে বাংলা ভাষার সংকটকালে দাঁড়িয়ে আমাদের স্বস্তি দেয়, শুধু বাংলা ভাষায় লিখে এক বাঙালি সাহিত্যিকের সর্বভারতীয় হয়ে ওঠার কাহিনী।
‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের সম্পদ ,২০১২ সাল পর্যন্ত উপন্যাসটির ১১১তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যে বিরল কৃতিত্ব। চৌরঙ্গী উপন্যাস অবলম্বনে তৈরী হয়েছে সিনেমাও, যা চূড়ান্ত জনপ্রিয়। তাঁর চারটি উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র।কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray) তাঁর ‘সীমাবদ্ধ’ ও ‘জন অরণ্য’ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন যা দর্শকমহলে সমাদৃত। সাহিত্য ও চলচ্চিত্র – লেখনীর বলে দুই জগতেই সমান জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি।
স্বাধীনতা পূর্বে বনগাঁয় জন্মগ্রহণ করলেও তার কিশোর জীবন শুরু হয়েছিল কলকাতাতেই, স্বাধীনতার সময়কার উত্তাল কলকাতার সাক্ষী তিনি। কিশোর বয়সে বাবাকে হারিয়ে পেটের তাগিদে অফিসের কেরানির কাজ থেকে হকারি এমনকি গৃহপরিচালকের কাজও করেছেন তিনি। কিন্তু এই সব প্রতিকূলতার মাঝেও চালিয়ে গেছিলেন পড়াশোনা, রিপন কলেজে পড়ার পাশাপাশি তিনি কাজ নেন কলকাতা হাইকোর্টের শেষ ব্রিটিশ ব্যারিস্টার ফ্রেডরিক বারওয়েলের কাছে। সেই অভিজ্ঞতাকেই আশ্রয় করেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’। তার সৃষ্ট উপন্যাসগুলোর ভাবনা কখনও একই জায়গায় থেমে থাকেনি, জীবনের নানা ওঠা-পড়া, সূক্ষ অনুভূতি থেকে ইতিহাস, আধ্যাত্মিকতাতেও তিনি সাবলীলতার পরিচয় দিয়েছেন।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ,পাঠকদের মনে জায়গা করে নেওয়া শংকরের ঝুলিতে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার এসেছিলো ২০১৪ সালে ‘একা একা একাশি’ উপন্যাসের হাত ধরে। বইপাড়া কিংবা কফি হাউসের দেওয়ালে কান পাতলে এখনও শোনা যাবে সাহিত্যপ্রেমীদের দীর্ঘশ্বাস – আক্ষেপ, সাহিত্যজগতে প্রায় ৬০ বছর কাটিয়ে চৌরঙ্গী’ , ‘জন অরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’ এর মতো উপন্যাস পাঠকদের উপহার দেওয়ার বহু পরেই এই স্বীকৃতি পেয়েছিলেন সাহিত্যিক মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। তবে পাঠকের ভালোবাসা সবসমই ঘিরে থাকতো তাঁকে। আর আজ তাঁর প্রয়াণে জনশুন্য হলো চৌরঙ্গী, শোকস্তব্ধ হলেন সাহিত্যপ্রেমীরা। অজানার পথে চলে গেলেন সকলের প্রিয় শংকর থেকে গেলো তার অন্যন্য সব সৃষ্টি।

