পশ্চিমবঙ্গ

বারুইপুরে কিশোরীর রহস্যমৃত্যু ঘিরে তাণ্ডব! ধ*র্ষণের পর খুনের অভিযোগ, গণপিটুনিতে মৃত্যু সন্দেহভাজনের

নিখোঁজের পর পুকুর থেকে উদ্ধার ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়ার দেহ। এক অভিযুক্ত গ্রেপ্তার, বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি। ক্ষোভে পথ অবরোধ, পুলিশ ক্যাম্পে ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ, নামখানা লাইনে ট্রেন চলাচল ব্যাহত।

নিজস্ব সংবাদদাতা : বারুইপুরে পুকুর থেকে নিখোঁজ কিশোরীর মৃতদেহ উদ্ধার। ধ*র্ষণের পর খুন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পরিবারের। ঘটনাকে কেন্দ্র করে রবিবার সকাল থেকে উত্তাল বারুইপুরের সূর্যপুর হাট এলাকা। জানা গেছে, বারুইপুর থানা এলাকার ধপধপি-২ পঞ্চায়েতের সূর্যপুর হাট এলাকার বাসিন্দা ওই কিশোরী শনিবার বিকেল প্রায় ৪ টা নাগাদ বাড়ি থেকে বের হয়। পরিবারের দাবি, খাবার কিনতে যাওয়ার কথা বলে সে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। রাতভর বহু খোঁজাখুঁজির পরেও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি তার। এরপরেই রবিবার সকালে বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটি পুকুরে ষষ্ঠ শ্রেণীর পড়ুয়া ওই কিশোরীর দেহ ভাসতে দেখা যায়। পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কিশোরীকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধ*র্ষণ করার পর খুন করে দেহটি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার খবর প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন এলাকার বাসিন্দারা। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, প্রভাস মন্ডল নামের এক প্রতক্ষদর্শী শনিবার বিকেলে ৪জন যুবককে তার সঙ্গে দেখেছিলেন। তাদের মধ্যে আনন্দ নামের এক যুবক ওই কিশোরীকে নৃশংসভাবে খুন করেছে বলে জানান তিনি। যদিও প্রভাস মন্ডলও অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছে বলে সন্দেহ ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর।
বিক্ষোভকারী সাধারণ মানুষের দাবি অনুযায়ী, এই নৃশংস ও মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে ৪ থেকে ৫ জন অভিযুক্ত ব্যক্তি জড়িত রয়েছে। পুলিশ ইতিমধ্যেই তাদের মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করে বারুইপুর থানায় নিয়ে গিয়েছে। তবে বাকি অভিযুক্তদেরও দ্রুত গ্রেপ্তার করা এবং তাদের মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসি কার্যকর করার দাবিতে ক্ষুব্ধ জনতা কুলপি রোডে নির্যাতিতার দেহটি রাস্তার ওপর রেখে পথ অবরোধ কর্মসূচি শুরু করে। পুলিশ যখন পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং অবরোধ সরানোর চেষ্টা করে, তখন পরিবেশ অত্যন্ত অগ্নিগর্ভ ও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। উত্তেজিত বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ওপর চড়াও হন এবং এর ফলে সূর্যপুর পুলিশ ক্যাম্পে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
এই গণবিক্ষোভের তীব্রতা ও ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে রেললাইনেও, যার সরাসরি প্রভাবের ফলে শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখার অন্তর্গত নামখানা লাইনে দীর্ঘ সময় ধরে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, পুলিশের চরম গাফিলতি ও উদাসীনতার কারণেই এই মর্মান্তিক ও অকাল মৃত্যু ঘটল; যদি পুলিশ শনিবার রাতে ঘটনার সময় যথাযথভাবে তৎপরতা দেখাত এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিত, তবে হয়তো মেয়েটিকে রক্ষা করা সম্ভব হতো।
বিক্ষোভ চলাকালীন সময়েই স্থানীয় একজন যুবককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। এলাকার মানুষের একটি অংশের দাবি অনুযায়ী, নিহত যুবককে ঘটনার সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে দেখা গিয়েছিল, যার ফলে স্থানীয়দের একাংশ তাকেও ঘটনার সাথে যুক্ত বা সন্দেহভাজন হিসেবে দাবি করছেন।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী জানা গিয়েছে যে, গণপিটুনির ফলে প্রাণ হারানো ওই যুবকের নাম হলো ২৬ বছর বয়সী ইন্দ্রজিৎ তাঁতি। স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, একজন নাবালিকাকে অত্যন্ত নির্মমভাবে অত্যাচার করা এবং পরবর্তীতে তাকে খুনের যে ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে ইন্দ্রজিৎ সরাসরিভাবে জড়িত ছিল। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে রবিবার সকালে তাকে ওই এলাকায় দেখতে পাওয়ার সাথে সাথেই স্থানীয় উত্তেজিত জনতা তাকে ধরে ফেলে। এরপর তাকে নিয়ে ব্যাপক গণধোলাইয়ের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ইন্দ্রজিৎ অত্যন্ত গুরুতর জখম অহয়ে পরে ; পরবর্তীতে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই চরম উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ঘটনাস্থলে দ্রুত পুলিশ বাহিনী পৌঁছায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। পরিস্থিতি শান্ত করতে গিয়ে কয়েক জন পুলিশকর্মীও হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ বিক্ষোভ এবং উত্তেজনার পর শেষপর্যন্ত পুলিশ নির্যাতিতার দেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যায়।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মর্মান্তিক এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু করা হয়েছে। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এই ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে ইতিমধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ঘটনার পেছনে থাকা বাকি অভিযুক্তদের দ্রুত শনাক্ত করার লক্ষ্যে পুলিশি তল্লাশি অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ব্যাপক চাপা উত্তেজনা রয়েছে।নৃশংস এই খুনের ঘটনায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ, রাজনীতির উর্ধে অবিলম্বে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অন্যথায় থানা অবরোধের হুঁশিয়ারীও দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শান্তি ও স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য এলাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
বিক্ষোভ চলাকালীনই নির্যাতিতার বাবার সঙ্গে সরাসরি টেলিফোনে যোগাযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী,  শোকাতুর ও বিপর্যস্ত পরিবারটিকে মানসিকভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি তিনি প্রশাসনের পক্ষ থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে সব ধরনের কঠোর ও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করার দৃঢ় আশ্বাস দেন। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এই মামলার সাথে যুক্ত সমস্ত দোষী ব্যক্তিদের কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী যা যা ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হবে, তা নিশ্চিতভাবে কার্যকর করা হবে। ঘটনার প্রেক্ষিতে আগামী মঙ্গলবার (৭ জুলাই) নির্যাতিতার পরিবারকে দেখা করার উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী ডেকে পাঠিয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন যে, সেদিন নবান্ন বা ভবানী ভবনে বসে তিনি নিজে পরিবারের সমস্ত দাবি ও অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শুনবেন এবং অপরাধীদের যাতে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর সাজা প্রদান করা হয়, তা তিনি ব্যক্তিগতভাবে সুনিশ্চিত করবেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *