কলকাতা

​ভোটার তালিকা থেকে নাম ছাঁটাই : ‘ভোটের অধিকার’ কি এখন নথির দয়ায়?

নির্বাচন কমিশন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ২০০২ সালের তালিকায় নিজের বা পূর্বসূরিদের নাম থাকলে ২০২৬ সালের তালিকায় নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে উঠে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র।

7এ নিউজ ডেস্ক : গণতন্ত্রের উৎস হলো মানুষের ভোটাধিকার। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ভোটার তালিকায় ‘SIR’ (Special Intensive Revision) বা বিশেষ পর্যালোচনার নামে যা চলছে, তা কোনো সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; বরং লক্ষ লক্ষ মানুষের নাগরিক সত্ত্বাকে অস্বীকার করার এক পরিকল্পিত নীল নকশা বলে অভিযোগ উঠছে। ২০০২ সালকে ভিত্তি বছর ধরে যে ১৩টি দুষ্প্রাপ্য নথির দাবি করা হয়েছে, তা প্রান্তিক ও অশিক্ষিত মানুষের কাছে এক অগম্য প্রাচীর। প্রশ্ন উঠেছে, এই প্রক্রিয়া কি পরোক্ষভাবে রাজ্যে এনআরসি (NRC) কার্যকর করারই নামান্তর?
​নথির বৈষম্য ও প্রান্তিক মানুষের সংকট
​নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য পাসপোর্ট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা পোস্ট অফিসের বইয়ের মতো যেসব নথির তালিকা দিয়েছে, তা এদেশের ৮০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের কাছে অলীক স্বপ্ন। বহু মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ দেশে বাস করছেন, যাদের কাছে পৈতৃক জমির দলিল বা পরচা রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই অকাট্য ভূমি-দলিলকেও মান্যতা দেওয়া হচ্ছে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা দুর্ঘটনায় নথি হারিয়ে ফেলা একজন দিনমজুর বা ভূমিহীন কৃষক কি তবে আজ থেকে ‘বেনাগরিক’? কাগজ কি কোনোদিনও রক্ত-মাংসের মানুষের পরিচয়ের চেয়ে বড় হতে পারে?
এছাড়াও আছে ​ডিজিটাল অস্পষ্টতা ও কমিশনের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ।
​নির্বাচন কমিশন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ২০০২ সালের তালিকায় নিজের বা পূর্বসূরিদের নাম থাকলে ২০২৬ সালের তালিকায় নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে উঠে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র।
বরং ​তথ্য উধাও করে দেওয়া হয়েছে। কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া ২০০২ সালের তথ্যভাণ্ডারে অসংখ্য মানুষের নাম রহস্যজনকভাবে নেই।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সংস্থা ২০০২ সালে Summary Revision হওয়া সত্ত্বেও অসততার আশ্রয় নিয়ে বলছে SIR হয়েছিল।এছাড়াও মানুষের সামনে তথ্য সংগ্রহে
আছে ​ডিজিটাল বাধা।১৯৫২ সাল থেকে সমস্ত নির্বাচনি তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হলে মানুষ সহজেই নিজেদের উত্তরাধিকার প্রমাণ করতে পারত। কিন্তু তা না করে অস্বচ্ছতার আবহে সাধারণ মানুষকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে।
​হয়রানির শুনানি: নাম থাকা সত্ত্বেও লক্ষ লক্ষ মানুষকে ‘হিয়ারিং’-এর নামে দিনের পর দিন ঘুরিয়ে হয়রান করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় পৌনে এক কোটি মানুষের নাম ‘ডিলিট’ হয়েছে যাদের নাম খসড়া তালিকাতে ওঠেনি এবং ফাইনাল রোল থেকেও বাদ গিয়েছে। এছাড়াও ‘অ্যাডজুডিকেশন’-এর জালে বন্দি প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ।
করা হয়েছে ​সংবিধান ও ঐতিহাসিক চুক্তির অবমাননা।
​জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব লাভ একটি সর্বজনীন ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার। ১৯৫৫ সালের মূল নাগরিকত্ব আইনের চেতনা এবং দেশভাগের প্রেক্ষাপটে হওয়া নেহেরু-লিয়াকত বা নেহেরু-নুন চুক্তির মূল ভিত্তি ছিল উদ্বাস্তুদের নিঃশর্ত আশ্রয় ও সম্মান। বর্তমান সরকার সেই ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি ও আইনি রক্ষাকবচকে তুচ্ছ করে একের পর এক সংশোধনী এনেছে। এর ফলে দেশভাগের শিকার হওয়া মানুষ আজ নিজ ভূমিতেই পরবাসী হওয়ার আশঙ্কায় দিন গুনছেন।
​নেপথ্য উদ্দেশ্য: সস্তা শ্রম ও কর্পোরেট স্বার্থ
​সমালোচকদের মতে, এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে এক গভীর অর্থনৈতিক ষড়যন্ত্র। যখন কয়েক কোটি মানুষ রাষ্ট্রহীন বা ‘বেনাগরিক’ হয়ে পড়বেন, তখন রাষ্ট্র তাদের সামাজিক সুরক্ষা ও অধিকারের দায় ঝেড়ে ফেলবে। এই অধিকারহীন বিশাল জনগোষ্ঠীকে তখন কর্পোরেট জগত ‘সস্তা শ্রমিক’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে। তাদের জমি ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখলের পথও প্রশস্ত হবে।
​শেষ কথা
​ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া মানে একজন মানুষের রাজনৈতিক অস্তিত্ব মুছে ফেলা। ভারতের সংবিধান যেখানে প্রত্যেক নাগরিককে সমান অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়, সেখানে নথির গেরোয় ফেলে মানুষকে ‘বেনাগরিক’ করা সংবিধানের চরম অবমাননা। নির্বাচন কমিশনের উচিত অবিলম্বে এই হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ১৯৫২ সাল থেকে সমস্ত রেকর্ড স্বচ্ছভাবে জনসমক্ষে আনা এবং মানুষের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করা। নতুবা ইতিহাসের কাঠগড়ায় বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে এক চরম গণবিরোধী পদক্ষেপের দায় নিতে হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *