নির্বাচনী সমীক্ষা -২য় পর্ব
উত্তর ২৪ পরগণায় মূলত উদ্বাস্তু বিশেষত নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষদের নাম বাদ গিয়েছে এবং এনারা মূলত বিজেপির ভোটার যার কারনে নমঃশূদ্র এলাকায় বিজেপির ভোট কমবে।তবে একই সঙ্গে বসিরহাট, বাদুড়িয়া, হাসনাবাদে,গোসাবাতে মুসলিম নাম বাদ পড়ায় বিজেপির সুবিধা হবে, কারন বাদ যাওয়ারা তৃণমূল সমর্থক, সুতরাং বিজেপি লাভবান হবে।তবে পানিহাটির ভোটের ফলাফল বিজেপির অনূকুলে ও কামারহাটির ফলাফল বামেদের অনূকুলে যেতে পারে।
নিজস্ব সংবাদদাতা: SIRএর ফলে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ভোটার লিস্টে ঘটেছে। কলকাতা (Kolkata) ও উত্তর ২৪ পরগণায় বিপুল পরিমানে হিন্দিভাষী, গুজরাটি ও ওড়িয়া ভোটারদের নাম বাদ গিয়েছে।কারন একই সময়ে হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতে SIR হওয়ায় তাদের নাম পশ্চিমবঙ্গে বাদ গিয়েছে। এদের বৃহৎ অংশ বিজেপি সমর্থক হওয়ায় বিজেপির ভোটের হার কমবে। ফলত বিজেপির আসন সংখ্যা কলকাতায় কমবে।উত্তর ২৪ পরগণায় মূলত উদ্বাস্তু বিশেষত নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষদের নাম বাদ গিয়েছে এবং এনারা মূলত বিজেপির ভোটার যার কারনে নমঃশূদ্র এলাকায় বিজেপির ভোট কমবে।তবে একই সঙ্গে বসিরহাট, বাদুড়িয়া, হাসনাবাদে,গোসাবাতে মুসলিম নাম বাদ পড়ায় বিজেপির সুবিধা হবে, কারন বাদ যাওয়ারা তৃণমূল সমর্থক, সুতরাং বিজেপি লাভবান হবে।তবে পানিহাটির ভোটের ফলাফল বিজেপির অনূকুলে ও কামারহাটির ফলাফল বামেদের অনূকুলে যেতে পারে।দঃ২৪ পরগণার ভাঙরের ফলাফল তৃণমূলের অনূকুলে যেতে পারে।মালদা ও মুর্শিদাবাদে মুসলিম নাম বাদ গেলেও কেবলমাত্র মালদাতে এর সুফল বিজেপি পেলেও মূর্শিদাবাদে বিজেপির বিপর্যয় হবে।কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিঙের সমতল, আলিপুরদুয়ারে কমতাপুর স্টেট ডিমান্ড কমিশনের ভোটপ্রার্থী দেওয়ার বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক প্রভাবিত হতে পারে।কামতাপুরীদের প্রতি নরম মনোভাব ও আলাদা ইউনিয়ন টেরিটরি হতে পারে এই আশঙ্কায় কোচবিহার বাদে বাকী উত্তরবঙ্গে বিজেপির বিপর্যয় অপেক্ষা করছে,বিশেষত জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার ও দুই দিনাজপুরে।বিজেপির একমাত্র লাভের জায়গা বিজেপি।মালদায় কংগ্রেস ২ টি আসন পেতে পারে।উত্তরবঙ্গে বামেরা উত্তর দিনাজপুরে ও দার্জিলংএ মোট ২ টি আসন পেতে পারে।দক্ষিনবঙ্গের বিজেপির শক্ত ঘাঁটি পশ্চিম বর্ধমান,ওখানে শতশত কারখানা হয়েছে, চাকরী পেয়েছে মূলতঃ নবাগত হিন্দিভাষীরা যারা বিজেপিকেই ভোট দেবে, আবার তৃণমূল বাঙালি জনসমাজকে অবহেলা করায় তৃণমূল ভোট পাবেনা। হয় বিজেপি আর কিছুটা বামেরা পাবে।বামেদের পাওয়ার সম্ভাবনা জামুড়িয়া ও কুলটি, হিরাপুর আসন। পূর্ব বর্ধমানে বিজেপি পিছিয়ে পড়বে।নদীয়াতে বিজেপির বিপর্যয় হবে, লাভবান হতে পারে সিপিএম ও তৃণমূল। হুগলী ও হাওড়াতে ভোট শেয়ার বামেদের বাড়বে, কতটা বাড়বে তার উপর নির্ভর করবে বিজেপির (BJP) সিট কতটা কমবে। তবে কমবে কারন SIR এ উল্লেখযোগ্য ভাবে বিজেপির ভোট কমবে। উত্তরপাড়া ও বালি ও চাপদানি কেন্দ্র বামেদের দিকে যেতে পারে। বাঁকুড়া, পঃমেদিনিপুর ও পুরুলিয়াতে তৃণমূলের অবস্থা বেশ খারাপ।বীরভূমে তুলনায় তৃণমূলের (TMC) ফল ভালো হবে একমাত্র বোলপুর ছাড়া। আশ্চর্যের বিষয় বাম ভোটাররা তৃণমূলকে মুছে দিতে বিজেপিকে ভোট দিতে পিছপা নয়। বাংলাপক্ষের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কলকাতা, আসানসোল অঞ্চল ও শিলিগুড়ি জলপাইগুড়িতে বিজেপির ফলাফলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
এবার উপরোক্ত তথ্যগুলির বিশ্লেষণ।
পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গভীর এবং তথ্য বিচার করে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে যে সমীকরণগুলি তুলে ধরেছি, তা বর্তমান রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছেও অন্যতম চর্চার বিষয়। বিশেষ করে SIR (Special Intensive Revision) বা ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনী এবারকার নির্বাচনের ‘X-Factor’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপরের পয়েন্টগুলো ধরে একটি বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ নিচে দেওয়া হলো:
১. SIR এবং জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রভাব:
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া বা ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ (Under Adjudication) থাকা প্রায় ১.২ কোটি ভোটারের ভাগ্য এবার জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দেবে।
হিন্দিভাষী ও বহিরাগত ভোটার: যুক্তিটি যুক্তিযুক্ত যে, সর্বভারতীয় স্তরে ডেটা লিঙ্কেজ এবং অন্যান্য রাজ্যেও একই সাথে SIR চলায় বহু দ্বৈত ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। কলকাতা এবং উত্তর ২৪ পরগনার শিল্পাঞ্চলে এটি বিজেপির ‘কোর’ ভোটব্যাঙ্কে বড় ধাক্কা দিতে পারে।
উদ্বাস্তু ও নমঃশূদ্র সমীকরণ: উত্তর ২৪ পরগনায় ও নদীয়ায় ও জলপাইগুড়ি জেলায় নমঃশূদ্র ভোটারদের একটি বড় অংশ বিজেপির সমর্থক হলেও, ভোটার তালিকায় এই বড় ধরণের রদবদল তাদের মধ্যে আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে যা বিজেপির প্রতিকূলে যাবে। অন্যদিকে, বসিরহাট বা সংলগ্ন এলাকায় তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কেও যদি সমপরিমাণ ঘাটতি তৈরি হয়, তবে সামগ্রিক সিট শেয়ারিংয়ে তার ভারসাম্য বজায় থাকতে পারে।
২. উত্তরবঙ্গ ও কামতাপুর ফ্যাক্টর
উত্তরবঙ্গে বিজেপির একাধিপত্য এবার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
কামতাপুর স্টেট ডিমান্ড: কামতাপুরীদের প্রতি কেন্দ্রের নরম মনোভাব বা ‘ইউনিয়ন টেরিটরি’র আশ্বাস জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও দুই দিনাজপুরে রাজবংশী ভোটকে কতটা সংহত করতে পারবে তা নিয়ে সংশয় আছে তবে একই সঙ্গে তা আঁটকানোর জন্য অরাজবংশী ভোট তৃণমূলে যেতে পারে । যদি কামতাপুর সেন্ট্রিক ছোট দলগুলো আলাদা প্রার্থী দেয়, তবে বিজেপির ভোট ভাগ হয়ে তৃণমূল বা বামেদের সুবিধে করে দিতে পারে। কোচবিহার বাদ দিলে বাকি উত্তরবঙ্গে বিজেপির লড়াই এবার অনেক বেশি কঠিন।
৩. বামেদের পুনরুত্থান ও শিল্পাঞ্চল (পশ্চিম বর্ধমান)
পশ্চিম বর্ধমানের আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে নবাগত ভোটারদের একটা বড় অংশ নিশ্চিতভাবেই বিজেপির দিকে ঝুঁকবে, কিন্তু স্থানীয় স্তরে বাংলা পক্ষ-এর প্রচার এবং বাঙালি শ্রমজীবী মানুষের ক্ষোভ তৃণমূলের থেকে সরে গিয়ে কিছুটা বামেদের দিকেও ফিরতে পারে।
আরবান পকেট: উত্তরপাড়া, বালি বা চাপদানির মতো এলাকাগুলোতে বামেদের ভোট শতাংশ বাড়লে সেটা মূলত বিজেপির বিরোধী ভোটকে সংহত করবে। বামেদের জন্য এটি হবে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, যেখানে ‘তৃণমূলকে সরাতে বিজেপিকে ভোট’ দেওয়ার পুরনো মানসিকতা কিছুটা হলেও কমতে দেখা যাচ্ছে।
৪. বাংলা পক্ষ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ
কলকাতার নগরকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি-হুগলি জেলা- পঃবর্ধমানের কিছু শহরে ‘বাংলা পক্ষ’-এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিজেপির তথাকথিত ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান’ ন্যারেটিভের বিপরীতে একটি শক্ত দেওয়াল তুলে দিয়েছে। এটি মূলত শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি ভোটারদের ভোট বিজেপি থেকে বিমুখ করতে পারে, যার সরাসরি লাভ তৃণমূল বা বামেদের ঘরে যাবে।
৫. জেলাভিত্তিক সংক্ষিপ্ত সারমর্ম:
মালদা ও মুর্শিদাবাদ: মালদাতে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ভোটার তালিকা সংশোধন বিজেপির জন্য সুযোগ তৈরি করলেও, মুর্শিদাবাদে বিজেপির পক্ষে বড় বিপর্যয় ঘটা অস্বাভাবিক নয়।মালদায় বিজেপির কিছু লাভ হতে পারে SIR’র মাধ্যমে মুসলিম ভোটার বাদ দেওয়ায়।
জঙ্গলমহল (বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর): এখানে তৃণমূলের প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাওয়া প্রবল। কিন্তু বিজেপি যদি SIR-এর কারণে তাদের গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে না পারে, তবে তৃতীয় শক্তি হিসেবে বামেদের প্রভাব বাড়তে পারে।
বীরভূম: বীরভূমে বোলপুর বাদে বাকি জেলায় তৃণমূলের সংগঠন এখনও শক্তিশালী, বিশেষত সামাজিক প্রকল্পগুলোর সুবিধা সেখানে তৃণমূলের ভোট ধরে রাখতে সাহায্য করবে।
উপরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারকার নির্বাচন কেবল ‘তৃণমূল বনাম বিজেপি’ নয়, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ডেটা বনাম ডেমোগ্রাফিক্স’-এর লড়াই। ভোটার তালিকা থেকে এই বিপুল পরিমাণ নাম বাদ যাওয়া যদি কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয়, তবে তা ভোটের দিন মেরুকরণকে আরো তীব্র করবে।



