আন্তর্জাতিকখেলা

বিশ্বকাপে মহাঅঘটন! জার্মানিকে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল ইকুয়েডর

দুই মিনিটেই পিছিয়ে পড়েও দুরন্ত প্রত্যাবর্তন, ২-১ গোলে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে হারিয়ে নকআউটে ইকুয়েডর; দেশজুড়ে জাতীয় ছুটি ঘোষণা প্রেসিডেন্টের, বললেন - 'ইকুয়েডর দীর্ঘজীবী হোক।’

স্পোর্টস ডেস্ক : বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম বড় অঘটন ফুটবল বিশ্বকাপের (FIFA World Cup 2026) গ্রুপ ‘E’-এর একদম শেষ ম্যাচে। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি ম্যাচের শুরুতে ইকুয়েডরের (Ecuador) বিরুদ্ধে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে পরাজিত হয়। জার্মানির গ্রুপ পর্বের প্রথম দু’টি ম্যাচ জিতেছিল, যার ফলে তারা আগেই নকআউট পর্বের জন্য নিজেদের স্থান নিশ্চিত করে ফেলেছিল। ফলে এই হারের পরেও তারা টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, এই দুর্দান্ত ও ঐতিহাসিক জয়ের ফলে ইকুয়েডর সেরা তৃতীয় দল হিসেবে পরবর্তী রাউন্ডে নিজেদের জায়গা পাকা করে নেয়। ১-২ গোলে জার্মানিকে হারিয়ে ইকুয়েডর এক বিশাল সাফল্য অর্জন করল এবং ২০০৬ সালের পর প্রথমবার কোনো লাতিন আমেরিকার দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের (FIFA World Cup 2026) নকআউট পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করল।
ফিলাডেলফিয়ার লিঙ্কন ফিনান্সিয়াল ফিল্ডে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচের সূচনা জার্মানির জন্য ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। ম্যাচের মাত্র দ্বিতীয় মিনিটেই জার্মানি লিড নিয়ে নেয়। শুরুর ১ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডের মাথায় লেরয় সানে (Leroy Sane) অসাধারণ এক গোলে দলকে এগিয়ে দেন। ফ্লোরিয়ান ভির্টজ়ের (Florian Wirtz) নিখুঁত পাস থেকে বলটি দুর্দান্তভাবে জালে জড়ান তিনি। তবে গোল হজম করার পর ইকুয়েডর মোটেও বিচলিত বা দমে যায়নি। নিজেদের সমর্থকদের প্রবল উৎসাহ ও উদ্দীপনা কাজে লাগিয়ে তারা খুব দ্রুতই ম্যাচে ফেরার লড়াই শুরু করে। ম্যাচের ৯ মিনিটের মাথায় নিলসন অ্যাঙ্গুলো (Nilson Angulo) এক দুর্দান্ত শটের মাধ্যমে ম্যানুয়েল ন্যুয়েরকে (Manuel Neuer) পরাস্ত করে সমতা ফিরিয়ে আনেন। মূলত জার্মান ডিফেন্সের কিছু মারাত্মক ভুলের সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়ে নেয় ইকুয়েডর।
এর পর থেকে বাকি সময়ে ম্যাচে যা ঘটল, তা জার্মানির কট্টর ভক্তরাও হয়তো কল্পনা করতে পারেনি। গোল করার পরেই  ইকুয়েডরের আত্মবিশ্বাস মুহূর্তের মধ্যে বহুগুণ বেড়ে যায়, অন্যদিকে জার্মানির আত্মবিশ্বাস ক্রমশ তলানিতে নেমে আসে। গোটা মাঠ জুড়ে তখন ইকুয়েডরের একচ্ছত্র দাপট দেখা যাচ্ছিল এবং বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলত তাদেরই নিয়ন্ত্রণে। প্রবল চাপের মুখে জার্মানির পুরো দলই কার্যত রক্ষণাত্মক হয়ে নিচে নেমে এসেছিল।
ম্যাচের সময় যত বাড়তে থাকে , ইকুয়েডর ততই খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে শুরু করে । ম্যাচের ৭৭ মিনিটে আসে সেই চূড়ান্ত মাহেন্দ্রক্ষণ। কর্নার থেকে তৈরি হওয়া একটি আক্রমণ থেকে বলটি পৌঁছে যায় গনজ়ালো প্লাতার কাছে। তাঁর অসাধারণ ফুটবল দক্ষতায় বলটি জালে জড়িয়ে তিনি জার্মান সমর্থকদের স্তব্ধ করে দেন। তাঁর এই গোলেই ইকুয়েডর ২-১ ব্যবধানে লিড নিয়ে যায়।
জার্মানি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের মাধ্যমে ম্যাচটি ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল, কিন্তু তারা সফল হতে পারেনি। ইকুয়েডরের রক্ষণভাগ গোল করার জন্য জার্মানিকে খুব সামান্যতম সুযোগও দিচ্ছিল না। জার্মানি বারবার শট নেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনো বলই লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে পারেনি। অন্যদিকে, ইকুয়েডরের প্রধান শক্তি ছিল তাদের গতি। বল পাওয়ার পর তারা যেভাবে দ্রুত গতিতে আক্রমণ করতে শুরু করল, তার সঙ্গে পাল্লা দিতে জার্মানি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়।
খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরো স্টেডিয়াম ইকুয়েডর সমর্থকদের উল্লাস ও চিৎকারে মুখরিত হয়ে ওঠে। হলুদ জার্সি পরা হাজার হাজার সমর্থক আনন্দে মেতে ওঠেন। ম্যাচের পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ইকুয়েডর কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেস।
জার্মানি এই ম্যাচে পরাজিত হলেও গ্রুপের শীর্ষে অবস্থান করেই শেষ ৩২-এ জায়গা করে নিয়েছে। তবে নকআউট পর্বের ঠিক আগে এই পরাজয় তাদের আত্মবিশ্বাসে একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে, ইকুয়েডর এই ঐতিহাসিক জয়কে পুঁজি করে নতুন স্বপ্ন ও আশা নিয়ে নকআউট পর্বে প্রবেশ করল।
এই অভাবনীয় সাফল্যের পর পুরো ইকুয়েডর জুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যোগ্যতা অর্জন করার খুশিতে ইকুয়েডর সরকার দেশজুড়ে জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেছে। ইকুয়েডর প্রেসিডেন্ট দানিয়েল নোবোয়া সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বার্তায় লেখেন, ‘আমাদের ফুটবলার এবং কোচদের প্রতি জানাই অশেষ ধন্যবাদ। যাঁরা এত সমালোচনা এবং অপমানের মুখেও কঠিন সময় পার করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এবং আজ গোটা দেশে অপার আনন্দ বয়ে এনেছেন, তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আগামীকাল দেশজুড়ে ছুটি থাকবে! ইকুয়েডর দীর্ঘজীবী হোক।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *