১৫বছর পর রাজ্য বাজেটে বাংলায় শিল্পায়নের লক্ষ্যে বড় ঘোষণা
সোমবার রাজ্যে বিধানসভায় রাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত যে বাজেট (West Bengal Budget 2026-27) পেশ করেছেন, তাকে এক কথায় সাহসী ও সংস্কারমুখী বলা যায়।

নিজস্ব সংবাদদাতা : বামফ্রন্টের শেষ সময়ে ২০০৬ সালে বিপুল জন সমর্থন নিয়ে সপ্তম বামফ্রন্ট গঠন হবার পর এ রাজ্যে শিল্প ও বিনিয়োগ টানতে অনেকটা ঝুঁকি মিয়েই সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রগণের পথে হেঁটেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তার মাসুল তাকে গুনতে হয়েছিল পরবর্তী ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেই। আর তারপরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত পনেরো বছরে আর্বান ল্যান্ড সিলিং আইন নিয়ে কোনও ঝুঁকিই নিতে চাননি। তার ফলে বিনিয়োগও বাংলার দিকে মুখ ফেরায়নি। অবশেষে আবার কেউ ঝুঁকি নেওয়ার সাহস দেখালেন। সোমবার রাজ্যে বিধানসভায় রাজ্যের নতুন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত যে বাজেট (West Bengal Budget 2026-27) পেশ করেছেন, তাকে এক কথায় সাহসী ও সংস্কারমুখী বলা যায়। কারণ, বাজেটে বাণিজ্য সহজীকরণ ব্যবস্থার উপর শুধু জোর দেওয়া হল না, রাজ্যে নতুন বিনিয়োগ টানতে এবং শিল্প পরিকাঠামোকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে বেশ কিছু কঠিন ও কঠোর সংস্কারের বার্তাও পৌঁছে দেওয়া হল শিল্প মহলে।
প্রথমতঃ বৃহৎ শিল্প বিনিয়োগে এক-জানালা (Single-Window) ব্যবস্থা
রাজ্যে বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব এলে তাকে স্বাগত জানাতে দ্রুত ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। এখন থেকে ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি প্রস্তাবিত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসনের থেকে আলাদা করে বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন, ট্রেড লাইসেন্স বা অন্যান্য অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। পরিবর্তে আন্তর্বিভাগীয় সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজ্য স্তরের এক-জানালা ব্যবস্থার (Single-Window System) অধীনে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমস্ত অনুমতির ব্যবস্থা করা হবে।
দ্বিতীয়তঃ আর্বান ল্যান্ড সিলিং আইনের পর্যালোচনা
দেশে পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র বড় রাজ্য যেখানে এখনও চালু রয়েছে আর্বান ল্যান্ড সিলিং পলিসি, যা বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছিলো দীর্ঘদিন ধরে। বাজেটে শহরাঞ্চলে জমির বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এবং বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে এই আইন (Urban Land (Ceiling and Regulation) Act, 1976) পর্যালোচনা করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।
তৃতীয়তঃ নতুন ‘ল্যান্ড ব্যাঙ্ক’ ও অব্যবহৃত জমির পুনরুদ্ধার
২০১১ আসলে পর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বারংবার রাজ্যে ল্যান্ড ব্যাঙ্কের কথা বললেও তা কার্যকরী হয় নি। এদিনের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, শিল্প-বৃদ্ধির পথ সুগম করতে এবং জমির ব্যবহার নিশ্চিত করতে পাবলিক সেক্টর আন্ডারটেকিং (SPSU) ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার হাতে পড়ে থাকা অব্যবহৃত জমি চিহ্নিত করে একটি সামগ্রিক ল্যান্ড ব্যাঙ্ক (Land Bank) গড়ে তোলা হবে। এ ছাড়াও, বিভিন্ন শিল্প তালুকে বরাদ্দ করা যে সমস্ত জমি চুক্তির সময়সীমার বেশি সময় ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে, সেগুলি পর্যালোচনা করে সরকার কোনও সুদ ছাড়া লিজ প্রিমিয়াম, সালামি ও অন্যান্য চার্জ ফেরত দিয়ে জমি পুনর্দখল করতে পারবে এবং সেই জমি স্বচ্ছ ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ করা হবে। বেসরকারি ক্ষেত্রে একক বা বহু-পণ্যভিত্তিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক স্থাপনে ইনসেন্টিভ প্যাকেজের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।
চতুর্থতঃ সিন্ডিকেট রাজ ও তোলা আদায় বন্ধে কড়া আইন
এ রাজ্যে গত ১৫ বছরে বিনিয়োগকারীদের সবচাইতে বড় অভিযোগ ছিল রাজনৈতিক মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীদের সিন্ডিকেট রাজ ও তোলা আদায় নিয়ে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে এবং ব্যবসা করার অতিরিক্ত খরচ কমাতে সরকারের কড়া অবস্থানের কথা জানিয়ে ঘোষণা করেন আইনানুগ বিনিয়োগকারীদের সিন্ডিকেট চার্জ এবং অন্যান্য বেআইনি অর্থ আদায় বা তোলাবাজি থেকে রক্ষা করতে নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে।



