কলকাতা

রাজ্য পুলিশের বড় রদবদল! CID থেকে সরিয়ে টেলিকমিউনিসানে সুপ্রতিম সরকার

সিআইডি ও আইবির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে এডিজি টেলিকম পদে সুপ্রতিম সরকার; নটরাজন রমেশবাবুর হাতে CID, বদল বিধাননগর, দার্জিলিং-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদেও।

নিজস্ব সংবাদদাতা : পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশ প্রশাসনে এক বড় ধরনের রদবদল। কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকারকে ফের একবার তাঁর বর্তমান পদ থেকে সরানো হলো। রাজ্য গোয়েন্দা বিভাগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই পুলিশ কর্তাকে সিআইডি (CID) এবং অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা আইবি (IB)-র পদ থেকে সরিয়ে এখন রাজ্য পুলিশের টেলিকমিউনিকেশনের এডিজি (ADG) পদে নিযুক্ত করা হয়েছে। প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটি একটি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদ হিসেবেই বিবেচিত হয়। অন্যদিকে, সিআইডি-র ডিজি (DIG CID) পদে আনা হয়েছে আইপিএস নটরাজন রমেশবাবুকে। উল্লেখযোগ্য যে, কিছুদিন আগে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে বন্দিদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন এবং সিম কার্ড উদ্ধারের গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে আইপিএস নটরাজন রমেশ বাবুর কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কারা দফতরের ডিজির দায়িত্বও পালন করতে হবে।
মঙ্গলবার জারি করা একটি সরকারি নির্দেশিকায় রাজ্য পুলিশ এবং কলকাতা পুলিশের মোট ৩৩ জন পদস্থ আইপিএস (IPS) ও ডব্লিউবিপিএস (WBPS) কর্মকর্তার বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কারা কোথায় বদলি হলেন:
আইপিএস সুপ্রতিম সরকারকে এডিজি সিআইডি পদ থেকে সরিয়ে এখন এডিজি টেলিকম পদে পাঠানো হয়েছে। এডিজি টেলিকম পদটি আসলে কী? রাজ্য পুলিশ যে নিজস্ব টেলিকম ব্যবস্থা ব্যবহার করে, সেই ওয়্যারলেস টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম বা বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে এডিজি টেলিকমের হাতে। তবে পুলিশ মহলে এই পদের গুরুত্ব খুব একটা বেশি নয়।
একইভাবে ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ পদে বদলি করা হয়েছে আইপিএস অফিসার প্রবীণ ত্রিপাঠীকেও। ২০০৪ ব্যাচের আইপিএস অফিসার প্রবীণ ত্রিপাঠীকে এবার হোমগার্ডের আইজি করা হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার চলাকালীন কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দাপ্রধান থেকে শুরু করে হাওড়া এবং ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন প্রবীণ। বর্তমানে তিনি রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্সে কর্মরত ছিলেন।
বিধাননগরের বর্তমান কমিশনার ত্রিপুরারি অথর্বকে রাজ্য পুলিশের ট্রাফিক অ্যান্ড রোড সেফটির এডিজি পদে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তাঁর শূন্য পদে বিধাননগরের নতুন কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন রাঠোর অমিতকুমার ভারত, যিনি এতদিন রায়গঞ্জ রেঞ্জের ডিআইজি (DIG) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এই রদবদলের প্রভাব উত্তরবঙ্গ এবং পশ্চিমাঞ্চলেও স্পষ্ট। পশ্চিমাঞ্চলের বর্তমান এডিজি ও আইজিপি বিশাল গর্গকে এখন রাজ্য আইবি-র এডিজি ও আইজিপি (ADG & IGP, IB WB) পদে নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁর শূন্য পদে পশ্চিমাঞ্চলের নতুন এডিজি ও আইজিপি হিসেবে আনন্দ কুমারকে পাঠানো হচ্ছে, যিনি বর্তমানে এডিজি, লিগ্যাল পদে কর্মরত।
বদলি হওয়া আইপিএস কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন দুঁদে পুলিশ অফিসার কে জয়রামন। তাঁকে এডিজি, উত্তরবঙ্গ পদ থেকে সরিয়ে ডিরেক্টরেট অফ ইকোনমিক অফেন্সের ডিরেক্টর পদে আনা হয়েছে। কলকাতা পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে; সেখানকার ডিসি পদে থাকা আইপিএস স্পর্শ নীলাঙ্গীকে এবার এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বেশ কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার এবং কমিশনারদেরও বদলি করা হয়েছে।
আইপিএস প্রতীক্ষা ঝড়খড়িয়া এতদিন দার্জিলিংয়ের পুলিশ সুপার হিসেবে কাজ করছিলেন, তাঁকে এখন কলকাতা পুলিশে বদলি করা হয়েছে। দার্জিলিংয়ের নতুন এসপি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন শ্রীকান্ত জগন্নাথ রাও, যিনি আগে কলকাতার ডিসি, ডিডি পদে ছিলেন। অন্যদিকে, আইপিএস মণীশ যোশিকে কলকাতা ট্রাফিক বিভাগ থেকে সরিয়ে কোচবিহারের এসপি পদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বারুইপুরে নাবালিকার ধর্ষণ ও খুনের মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে রাজ্য রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল, যার ফলে পুলিশ প্রশাসনের নজর বারুইপুরে অনেকটাই বেশি। এই পরিস্থিতিতে বারুইপুরের দুজন অ্যাডিশনাল এসপি-কেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে; পিনাকি দত্তর পরিবর্তে অতীশ বিশ্বাসকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক মহলে সুপ্রতিম সরকারের মতো একজন অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ অফিসারের সিআইডি থেকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ টেলিকমিউনিকেশন বিভাগে বদলি হওয়া নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন ও আলোচনা শুরু হয়েছে। সিআইডি বর্তমানে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত করছে, যার মধ্যে একটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য হলো নির্বাচনের সময় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে আনা জোড়া অভিযোগের তদন্ত। সেই মামলার তদন্ত চলাকালীন একবার সুপ্রতিম সরকারের জিজ্ঞাসাবাদের মুখেও পড়তে হয়েছিল অভিষেককে।
নবান্নের পক্ষ থেকে এই পরিবর্তনকে একটি ‘রুটিন বদলি’ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সুপ্রতিম সরকারের মতো শীর্ষস্তরের কর্তার বিভাগ পরিবর্তন এবং বিধাননগর ও দার্জিলিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পুলিশিং জোনে নতুন মুখ নিয়ে আসার পেছনে বিশেষ কোনো প্রশাসনিক কৌশল বা উদ্দেশ্য অবশ্যই রয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *