দেশ

আগস্ট থেকেই বাংলায় জনগণনা ! দিতে হবে ৩৪টি প্রশ্নের উত্তর, জেনে নিন সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া

প্রথম ধাপে ১-১৫ আগস্ট স্ব-গণনা (Self Enumeration), এরপর বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাই করবেন গণনাকর্মীরা। কী কী তথ্য দিতে হবে, কীভাবে হবে আবেদন এবং কোন ৩৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে—রইল বিস্তারিত।

নিজস্ব সংবাদদাতা : চলতি ২০২৬ সালের অগাস্ট মাস থেকে প্রায় ১৬ বছরের মাথায় শেষ পর্যন্ত হতে চলেছে ভারতের জনগণনা – আদমশুমারি বা সেন্সাস। আগেই নির্দেশিকা দিয়ে জানানো হয়েছিল বঙ্গে ভোট মিটলেই শুরু হয়ে যাবে জনগণনার কাজ, আর সেইমতো ইতিমধ্যেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয়ে গিয়েছে জনগণনার প্রস্তুতি।
কবে থেকে শুরু হচ্ছে জনগণনা ?
আগামী অগাস্ট মাস থেকেই দেশজুড়ে জনগণনার প্রথম পর্যায়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। এই প্রাথমিক পর্যায়ে মোট দুটি পৃথক ধাপ অনুসরণ করা হবে। প্রথম ধাপটি আগামী ১ অগাস্ট থেকে শুরু হয়ে ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত চলবে , যেখানে নির্ধারিত অনলাইন পোর্টালে প্রতিটি পরিবারকে তাদের প্রয়োজনীয় সকল তথ্য বিস্তারিতভাবে পূরণ করতে হবে। এরপর ১৬ অগাস্ট থেকে ৩১ অগাস্ট পর্যন্ত দ্বিতীয় ধাপে গণনাকর্মীরা প্রতিটি বাড়িতে সরাসরি উপস্থিত হয়ে অনলাইনে জমা দেওয়া তথ্যগুলোর সত্যতা ও নির্ভুলতা যাচাই করবেন। প্রাথমিক এই কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর, আগামী বছরের পুরো ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে জনগণনার চূড়ান্ত পর্বের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই কাজের জন্য প্রতিটি গণনাকর্মীকে গড়ে ১৫০ থেকে ১৮০টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ের দায়িত্ব পালন করতে হবে। পাশাপাশি,  গণনাকর্মীদের স্যাটেলাইট চিত্রের সাহায্য নিয়ে বিস্তারিত ম্যাপিংয়ের কাজও সম্পন্ন করতে হবে।

চলছে গণনাকর্মীদের প্রশিক্ষণ
ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন ব্লকে নিযুক্ত গণনাকর্মীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শুরু করা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে তাঁদের জনগণনার প্রতিটি সুনির্দিষ্ট ধাপ, নির্ভুলভাবে তথ্য সংগ্রহের বিভিন্ন পদ্ধতি এবং আধুনিক ডিজিটাল প্রক্রিয়ার ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে অবগত করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের সাথে কীভাবে সঠিক ও কার্যকরভাবে যোগাযোগ স্থাপন করতে হবে এবং তাঁদের যাবতীয় প্রয়োজনে কীভাবে সহযোগিতা প্রদান করতে হবে, সেই সমস্ত বিষয়গুলো তাঁদের হাতে-কলমে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে শেখানো হচ্ছে।

আসন্ন জনগণনাতে ‘সেল্ফ এনিউমারেশন’ বা স্বগণনা প্রক্রিয়ায় জোর দেওয়া হয়েছে, এই পদ্ধতিতে দেশের প্রত্যেক নাগরিক তাদের পরিবারের সাথে সম্পর্কিত যাবতীয় প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ একটি নির্দিষ্ট অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজেই নিজেরাই জমা দেওয়ার সুযোগ পাবেন, অর্থাৎ নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণেরও সুযোগ দিয়েছে সরকার। মূলত এই ‘সেল্ফ এনিউমারেশন’ কাজটির প্রধান দায়িত্ব পরিবারের সদস্যদের হলেও, এই পুরো প্রক্রিয়ায় গণনাকর্মীদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রশিক্ষণের সময় তাঁদের অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়ে বলা হচ্ছে যে, অগস্ট মাসের প্রথম ১৫ দিন তাঁদের নির্ধারিত বা দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়ত ঘুরে বেড়াতে হবে। সেখানে প্রতিটি বাড়ি পরিদর্শন করে পরিবারের সদস্য সংখ্যাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্যসমূহ অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জরিপ করতে হবে। এর পাশাপাশি, তাঁদের অন্যতম কাজ হলো সেল্‌ফ এনিউমারেশন বা স্বগণনার প্রক্রিয়ায় মানুষকে সরাসরি সাহায্য করা; অর্থাৎ যেসব পরিবার বা ব্যক্তিদের স্বগণনার ক্ষেত্রে সহায়তার প্রয়োজন হবে, গণনাকর্মীরা তাঁদের সেই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবেন। যদি কোনো ব্যক্তি প্রযুক্তিগত জটিলতা বা ডিভাইসের সমস্যার সম্মুখীন হন অথবা স্বগণনার পুরো প্রক্রিয়াটি বুঝতে কোনো অসুবিধা বোধ করেন, তবে গণনাকর্মীরা সরাসরি তাঁদের বাড়িতে গিয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কারিগরি ও নির্দেশনামূলক সাহায্য করবেন।

জনগণনায় কি প্রশ্ন করা হবে ?
সেল্‌ফ এনিউমারেশন বা স্ব-গণনা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার লক্ষ্যে নাগরিকদের পোর্টালে প্রবেশ করে মোট ৩৪টি প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর প্রদান করতে হবে। অনলাইনে এই ফর্ম পূরণের যাবতীয় কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা হলে, নিবন্ধিত নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বরে একটি ওটিপি (OTP) বা ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড পাঠানো হবে।
এক নজরে দেখে নিন কোন কোন ৩৪টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে –
১. লাইন নম্বর (এটি পোর্টালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকবে)
২. বাড়ির শনাক্তকরণ নম্বর
৩. সেন্সাস বা জনগণনার গৃহ নম্বর
৪. মেঝের প্রধান নির্মাণ উপাদান বা উপাদানসমূহ
৫. দেওয়ালের প্রধান নির্মাণ উপাদান বা উপাদানসমূহ
৬. ছাদের প্রধান নির্মাণ উপাদান বা উপাদানসমূহ
৭. সেন্সাস গৃহের প্রকৃত ব্যবহার বা উদ্দেশ্য নির্ধারণ
৮. এই সেন্সাস গৃহের বর্তমান বা বিদ্যমান অবস্থা
৯. উক্ত স্থানে বসবাসকারী মোট পরিবার সংখ্যা
১০. এই নির্দিষ্ট পরিবারে নিয়মিত বসবাসকারী মোট সদস্য সংখ্যা
১১. পরিবারের প্রধান ব্যক্তির নাম
১২. পরিবারের প্রধান ব্যক্তির লিঙ্গ
১৩. পরিবারের প্রধান তফসিলি জাতি, উপজাতি বা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত কি না
১৪. গৃহের মালিকানার বিস্তারিত বিবরণ
১৫. শুধুমাত্র এই পরিবারের হেফাজতে বা ব্যবহারের জন্য রয়েছে এমন বসবাসযোগ্য ঘরের সংখ্যা
১৬. এই পরিবারে বসবাসকারী বিবাহিত দম্পতির মোট সংখ্যা
১৭. পানীয় জলের প্রধান বা প্রাথমিক উৎস
১৮. জলের উৎসটি ঠিক কোথায় অবস্থিত
১৯. আলোর প্রধান বা প্রাথমিক উৎস
২০. বাড়িতে শৌচালয় ব্যবহারের সুবিধা আছে কি না
২১. শৌচালয়ের ধরন বা প্রকৃতি
২২. বাড়ির জলনিকাশী ব্যবস্থার বিবরণ
২৩. বাড়ির চৌহদ্দির বা সীমানার মধ্যে স্নানের সুব্যবস্থা আছে কি না
২৪. বাড়িতে রান্নাঘর এবং এলপিজি (LPG) সংযোগ আছে কি না
২৫. রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহৃত প্রধান জ্বালানির ধরন
২৬. বাড়িতে রেডিও বা ট্রানজিস্টর আছে কি না
২৭. বাড়িতে টেলিভিশন আছে কি না
২৮. ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রয়োজনীয় সুবিধা আছে কিনা
২৯. বাড়িতে কম্পিউটার বা ল্যাপটপ আছে কি না
৩০. টেলিফোন, মোবাইল বা স্মার্টফোন আছে কি না
৩১. সাইকেল, স্কুটার, মোটরসাইকেল বা মফেট আছে কি না
৩২. চারচাকার গাড়ি, জিপ বা মোটর ভ্যান আছে কি না
৩৩. এই পরিবারে প্রধানত কোন ধরনের খাদ্যশস্য গ্রহণ করা হয়
৩৪. যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর
এই সমস্ত মৌলিক প্রশ্নগুলোর পাশাপাশি নাগরিকদের আরও কিছু অতিরিক্ত এবং বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে হবে। যেমন, পরিবারে কতজন পুরুষ সদস্য রয়েছেন, কতজন মহিলা সদস্য আছেন এবং সেখানে কোনো রূপান্তরিত লিঙ্গ বা তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য বসবাস করছেন কি না, এই সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। এছাড়া, বসবাসের বাড়িটি কেমন, বাড়ির মেঝেটি কী ধরনের এবং ছাদের ধরণ কী—এই বিষয়গুলোর ক্ষেত্রেও বেশ কিছু নির্দিষ্ট বিভাগ বা শ্রেণিবিভাগ রয়েছে; তাই সংশ্লিষ্ট পরিবারকে তাদের প্রকৃত অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই এমিউমারেশন ফর্মটি পূরণ করতে হবে।

ভারতে শেষবার জনগণনা হয়েছিল ২০১১ সালে, সেই অনুযায়ী হিসেবে করলে ২০২১ সালেই ফের জনগণনা হওয়ার কথা ছিল। তবে করোনা অতিমারীর ভয়াবহতার কারণেই জনগণনা পিছোতে থাকে আর শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় ২০২৬ সালেই শুরু হবে জনগণনার কাজ। ইতিমধ্যেই জনগণনার কাজ শুরু হয়েছে দেশের বেশ কয়েকটি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে।  জনগণনা শুরু হয়ে গিয়েছে রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, মেঘালয় এবং দিল্লির পুর এলাকায়, এছাড়াও তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে গুজরাট, জম্মু-কাশ্মীর, লাদাখ এবং পুদুচেরিতেও। আর কদিন পরেই এবার বাংলার পালা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *