হালান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গ, শেষ আটে নরওয়ে! বিশ্বকাপকে বিদায় জানিয়ে অবসরের ঘোষণা নেইমারের
ব্রুনোর পেনাল্টি মিস, নিয়ল্যান্ডের দুর্দান্ত গোলকিপিং ও হালান্ডের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে হার পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ১৯৯০ সালের পর প্রথমবার শেষ ষোলোর ধাপ থেকেই বিদায় ব্রাজিলের, ম্যাচ শেষে অবসরের ঘোষণা দিলেন নেইমার।

স্পোর্টস ডেস্ক : ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে ফুটবলপ্রেমীরা আবারও এক অপ্রত্যাশিত অঘটনের সাক্ষী হলেন। পাঁচবারের বিশ্বজয়ী দল ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানের লড়াইয়ে পরাজিত করে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিল নরওয়ে। নিউ ইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে আর্লিং হালান্ডের দ্বিতীয়ার্ধের দুটি অসাধারণ গোলের কাছে হার মানতে বাধ্য হয় ব্রাজিল। এই পরাজয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। অন্যদিকে, দুর্দান্ত রক্ষণভাগ, অত্যন্ত শৃঙ্খলিত ফুটবল এবং নিখুঁত রণকৌশল প্রদর্শন করে শেষ আটের লড়াইয়ে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করল নরওয়ে। অনেক আশা জাগিয়েও আবারও ব্যর্থতার মুখে দাঁড়িয়ে খালি হাতে বিদায় নিল ব্রাজিল। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের শেষ আটের পর্বে উঠতে ব্যর্থ হলো ব্রাজিল।
ম্যাচটি শুরু হওয়ার প্রথম মুহূর্ত থেকেই উভয় দলই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে উদ্যত হয়েছিল। ম্যাচের একেবারে তৃতীয় মিনিটেই নরওয়ের পক্ষে বল জালে জড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। আলেকজান্ডার সরলথের একটি নিখুঁত পাস থেকে প্যাট্রিক বার্গ গোল করলেও সহকারী রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে অফসাইডের সংকেত দেন এবং ভিএআর প্রযুক্তি পর্যালোচনার পর সেই সিদ্ধান্তই বহাল থাকে। ম্যাচের ১০ মিনিট পর ব্রাজিল ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পায়। ম্যাথিউজ কুনহাকে বক্সের ভেতরে ফাউল করেন নরওয়ের একজন ডিফেন্ডার। রেফারি প্রথমে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত না দিলেও পরবর্তীতে ভিএআর পরীক্ষার পর পেনাল্টি প্রদানের নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই পেনাল্টি শটটি মিস করেন ব্রুনো গুইমারায়েস। নরওয়ের অতন্দ্র প্রহরী গোলরক্ষক অরইয়ান নিল্যান্ড ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেই শটটি রুখে দেন। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রুনো যেভাবে শটটি নিলেন তা অত্যন্ত সাধারণ। বর্তমান ফুটবলে পেনাল্টি মারার আগে কিছুটা থেমে যাওয়া একটি সাধারণ বিষয় হলেও, তা যদি গোলরক্ষকের হাতে বল তুলে দেয় তবে সেটি বড় ধরনের ভুল। দেখে মনে হয়েছে, ব্রুনো পেনাল্টি মারার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পটু নন। এমনকি কেন তাঁকে পেনাল্টি নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলো, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে; কারণ ভিনিসিয়াস উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি পেনাল্টি মারতেই পারতেন।
এরপরেও একাধিকবার সুযোগ পেয়েও নরওয়ের গোলকিপারের জন্য তা হাতছাড়া হয় ব্রাজিল – বাহিনীর। গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এবং ব্রুনো গিমারাইসের নিশ্চিত গোলের সুযোগগুলো নিয়ল্যান্ড দুর্দান্ত সব সেভ করে নষ্ট করে দেন। অন্যদিকে, নরওয়ের তারকা মার্টিন ওডেগার্ডও একটি ভালো সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু ব্রাজিলের গোলরক্ষক অ্যালিসন তা আটকে দিতে সক্ষম হন। ম্যাচের ৫৮ মিনিটে ভিনি জুনিয়রের একটি অসাধারণ থ্রু পাসে একদম ফাঁকা অবস্থায় বল পান বদলি খেলোয়াড় এনড্রিক। গোলরক্ষককে একা পেয়েও তিনি শটটি বাইরে পাঠিয়ে দেন। ম্যাচের পরিস্থিতি ও বিপর্যয়ের আভাস পেয়েই শেষ ভরসা হিসেবে ৬৮ মিনিটে নেইমারকে মাঠে নামান কোচ অ্যান্সেলোত্তি। কিন্তু এতেও ব্রাজিলের আক্রমণের ধার বা গতি ফিরে আসেনি। অবশেষে ৭৯ মিনিটে নরওয়ে তাদের প্রথম গোলের মাধ্যমে লিড নেয়। আন্দ্রেয়াস শেলডেরুপের বাঁ দিক থেকে আসা একটি ক্রস থেকে গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েসকে টপকে দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়ান আর্লিং হালান্ড। এর মাধ্যমে নরওয়ে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
গোল হজম করার পর ব্রাজিল ম্যাচে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের ৯০ মিনিটে হালান্ড ম্যাচের ভাগ্য চূড়ান্ত করে দেন। শেলডেরুপের দেওয়া পাসটি নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে অত্যন্ত দুরন্ত এক শটে জাল কাঁপিয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন তিনি। এই দ্বিতীয় গোলটি ব্রাজিলের জন্য ছিল অত্যন্ত লজ্জাজনক। গোল করার সময় অন্তত তিনজন ডিফেন্ডার তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং গোলরক্ষকও প্রস্তুত ছিলেন। অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বাঁ পায়ে মাটি স্পর্শ করে তিনি শটটি নেন এবং সবাইকে টপকে বল জালে প্রবেশ করে।
ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে কাসেমিরোর মুখে কনুই লাগার কারণে নরওয়ের বিরুদ্ধে পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। সেই পেনাল্টি থেকে গোল করে ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেন নেইমার,এই বিশ্বকাপে এটিই ছিল তাঁর একমাত্র গোল। তবে পেনাল্টির পরপরই রেফারি ম্যাচের সমাপ্তির বাঁশি বাজিয়ে দেন, ফলে ব্রাজিল সমতা ফেরানোর জন্য আর কোনো সময় পায়নি। শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই নিশ্চিত হলো যে, ১৯৯০ সালের পর প্রথমবারের মতো শেষ ষোলোর ধাপ থেকেই বিদায় নিল ব্রাজিল। ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই ফুটবল বিশ্বে আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় যখন নেইমার জুনিয়র আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণের ঘোষণা দেন।



