পশ্চিমবঙ্গ

বারুইপুর কিশোরী হত্যা মামলায় যুক্ত হলো গণধর্ষণের ধারা, ময়নাতদন্তে উঠে এলো শিউরে ওঠা তথ্য

বারুইপুরের নির্যাতিতার দেহে একাধিক আঘাত ও যৌন নির্যাতনের চিহ্ন, ফুসফুসে জল পাওয়ায় তদন্তে নতুন রহস্য; পুলিশি হেফাজতের আবেদন

নিজস্ব সংবাদদাতা : বারুইপুর কিশোরী হত্যা মামলায় এবার জুড়লো ধর্ষণের ধারা ৭০ (২) ,ঘটনার শুরু থেকেই নির্যাতিতার পরিবার দাবি করে আসছিল যে, ১২ বছরের ওই কিশোরীকে কেবল খুন করা হয়নি বরং ধ*র্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে; বর্তমানে তদন্তের অগ্রগতির সাথে সাথে সেই দাবিটিই কার্যত সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বারুইপুরে ঘটে যাওয়া এই নৃশংস ঘটনায় ১২ বছরের নাবালিকাকে কেবল নৃশংসভাবে খুনই করা হয়নি, বরং পাশবিক ও অমানুষিক গণধর্ষণও করা হয়েছিল। রবিবার রাতেই মৃত নাবালিকার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। প্রাপ্ত বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে নাবালিকার ওপর হওয়া চরম অত্যাচারের অভিযোগগুলো জোরালোভাবে উঠে এসেছে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে, যৌনাঙ্গে থাকা ক্ষত এবং শরীরের অন্যান্য চিহ্নগুলো স্পষ্টত অত্যাচার ও ধ*র্ষণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তদন্তকারী আধিকারিকদের সূত্রে জানা গিয়েছে যে, নির্যাতিতা কিশোরীর পরিবারের করা গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ সোমবার আদালতে খুনের ধারার পাশাপাশি গণধর্ষণের ৭০ (২) ধারাও যুক্ত করেছে।

ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ঠিক কী উঠে এসেছে?
রবিবার কাটাপুকুর মর্গে ওই নির্যাতিতার ছোট্ট শরীরের ময়নাতদন্ত করা হয়। সেই প্রাথমিক রিপোর্টটি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং শিউরে ওঠার মতো। রিপোর্টের প্রতিটি অংশ থেকেই ভয়ঙ্কর নির্যাতনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। প্রাথমিক রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নাবালিকার মাথায় কোনো ভারী বস্তু দিয়ে অত্যন্ত জোরে আঘাত করা হয়েছিল, যার ফলে মাথায় একটি গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো শক্ত জায়গায় জোরে ঠুকে দেওয়া বা কোনো ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করার ফলে এই ক্ষত তৈরি হয়েছে। প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, যৌন হেনস্থা এবং মাথায় আঘাত করার ফলে নাবালিকা যখন অচেতন হয়ে পড়ে, তখন তাকে বস্তাবন্দি করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
তাছাড়া, নাবালিকার গলা ও ঘাড়েও একাধিক ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। শরীরের বিভিন্ন অংশে আঁচড় এবং কামড়ের দাগও লক্ষ্য করা গেছে। সূত্রের খবর অনুযায়ী, তার যৌনাঙ্গেও একাধিক ক্ষত মিলেছে, যা থেকে অত্যাচার ও ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হচ্ছে। এই ঘটনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় বিষয় হলো, ময়নাতদন্তের সময় নাবালিকার ফুসফুসে জল পাওয়া গিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞদের মতে, কাউকে যদি মৃত অবস্থায় জলে ফেলা হয়, তবে তাঁর শরীরে জল প্রবেশ করার সম্ভাবনা থাকে না। কেবল জীবিত অবস্থায় যদি কেউ জলে ডুবে যায়, তবেই ফুসফুসে জল প্রবেশের সম্ভাবনা থাকে। এই বিষয়টি সামনে আসতেই বড় প্রশ্ন উঠেছে যে, নৃশংস অত্যাচারের পর কি নাবালিকাটিকে জীবিত অবস্থাতেই পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল?
ঘটনাটি তদন্তের প্রেক্ষিতে রবিবার থেকে সোমবারের মধ্যে মোট তিনজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। ধৃতদের কঠোরভাবে  জিজ্ঞাসাবাদ করেই প্রকৃত সত্য ও আসল ঘটনা সামনে আনার চেষ্টা করছে তদন্তকারী দল। বারুইপুরের এই নাবালিকা নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় প্রধান দুই অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল এবং দিবাকর সর্দারকে সোমবার বারুইপুর আদালতে পেশ করে পুলিশ। মামলাটির অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল প্রকৃতি বিবেচনা করে প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে ধৃতদের ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
সোমবারই এই নৃশংস কাণ্ডে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে তদন্তকারীরা তৃতীয় এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছেন। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, ধৃত এই তৃতীয় ব্যক্তিকে আগামী মঙ্গলবার আদালতে পেশ করা হবে।
তবে এই মামলায় পকসো (POCSO) ধারা যুক্ত হওয়ার ফলে একটি আইনি প্রশ্নও দেখা দিয়েছে। পকসো ধারা যুক্ত হওয়ার কারণে এই মামলার শুনানি কি অতিরিক্ত মুখ্য বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে চলবে, নাকি মামলাটি বিশেষ পকসো আদালতে স্থানান্তরিত করা হবে—তা নিয়ে বর্তমানে কিছুটা ধোঁয়াশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *