কলকাতা

জনআন্দোলনের নৈতিকতা বনাম রাজনীতির কারবার: আরজিকর পরবর্তী এক বিষণ্ণ চালচিত্র

নির্বাচনের প্রাক্কালে নিহত চিকিৎসকের মায়ের রাজনৈতিক মঞ্চে যোগদান এবং প্রার্থী হওয়া তাঁর ব্যক্তিগত অধিকার হতে পারে, কিন্তু সেই লড়াইকে তুচ্ছ করা কি মানায়? যেসব তরুণ তুর্কি, জুনিয়র ডাক্তার এবং সংগঠন নিজেদের ক্যারিয়ার বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রথম দিন থেকে বিচার চেয়ে রাস্তায় লড়লেন, তাঁদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা কেবল অকৃতজ্ঞতা নয়, বরং এক বিশাল গণআন্দোলনের মুখে চপেটাঘাত।

৭ এ নিউজ ডেস্ক: কলকাতার আরজিকর হাসপাতালে (R.G.Kar Hospital) এক তরুণী চিকিৎসকের ওপর ঘটে যাওয়া পাশবিক নৃশংসতা কেবল একটি অপরাধ ছিল না, তা ছিল আমাদের সামগ্রিক প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামোর এক চূড়ান্ত ব্যর্থতার দলিল। ঘটনার আদিপর্ব থেকেই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে যে সন্দেহের মেঘ ঘনীভূত হয়েছিল, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ না থাকলে হয়তো তা সত্যের আলোকবৃত্তে পৌঁছতেই পারত না। কিন্তু আজ কয়েক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর আন্দোলনের সেই পবিত্রতা আর রাজনীতির সংকীর্ণতার মধ্যে যে লড়াই শুরু হয়েছে, তা বিচারপ্রার্থী সাধারণ মানুষকে এক গভীর নৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

​প্রতিরোধের কারিগর বনাম প্রশাসনের তৎপরতা
​স্মরণ করা প্রয়োজন, ঘটনার দিন মৃতদেহ দ্রুত সরিয়ে ফেলার যে প্রশাসনিক তৎপরতা দেখা গিয়েছিল, তাকে রুখে দিয়েছিল সাধারণ মানুষের সতর্কতা। জুনিয়র ডাক্তার, পড়ুয়া এবং বাম-সহ বিভিন্ন গণসংগঠনের কর্মীরা সেদিন বুক দিয়ে শববাহী গাড়ি না আটকালে হয়তো প্রমাণ লোপাটের চক্রান্ত সফল হতো। সেই সময়কার ১২ ঘণ্টার বিলম্বিত পোস্টমর্টেম এবং তড়িঘড়ি সৎকার আজও জনমানসে স্বচ্ছতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রয়েছে। এই অন্ধকারের বিরুদ্ধেই গর্জে উঠেছিল আপামর জনতা।

অরাজনৈতিক উত্তাপ ও বৈচিত্র্যময় প্রতিবাদ
​আরজিকরের বিচার চেয়ে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার শক্তি ছিল তার ‘অরাজনৈতিক’ চরিত্রে। কোনো দলীয় পতাকা ছাড়াই পথে নেমেছিলেন সমাজের প্রান্তিকতম মানুষ। হাতে টানা রিকশাচালক থেকে শুরু করে পর্দানশীন সংখ্যালঘু নারী—প্রতিবাদের এই অনন্য কোলাজ ভারতের সমকালীন ইতিহাসে বিরল। মোমবাতির আলো আর স্লোগানে তিলোত্তমার বিচার চেয়ে যে দীর্ঘ রাত জাগা, তা ছিল মূলত এক সামাজিক শুদ্ধিকরণ।

​রাজনৈতিক দ্বিচারিতা ও সুবিধাবাদ
​আশ্চর্যজনকভাবে, এই প্রবল জনজোয়ারের মাঝেও প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিজেপির (BJP) ভূমিকা ছিল মূলত টেলিভিশন স্টুডিওর বাকযুদ্ধে সীমাবদ্ধ। একদিকে আরএসএস প্রধান যখন কলকাতা পুলিশের (Kolkata Police) ভূমিকার পিঠ চাপড়াচ্ছেন, অন্যদিকে তখন দেশের নানা প্রান্তে চিকিৎসকদের প্রতিবাদ দমনে খড়্গহস্ত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসছিল। এই দ্বিচারিতা প্রমাণ করে যে, সাধারণের ন্যায়বিচারের চেয়ে ক্ষমতার সমীকরণই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।

পরিবারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও আন্দোলনের অবমাননা
​এই আন্দোলনের সবচেয়ে ট্র্যাজিক বা বেদনাদায়ক মোড় সম্ভবত বর্তমান সময়টি। নির্বাচনের প্রাক্কালে নিহত চিকিৎসকের মায়ের রাজনৈতিক মঞ্চে যোগদান এবং প্রার্থী হওয়া তাঁর ব্যক্তিগত অধিকার হতে পারে, কিন্তু সেই লড়াইকে তুচ্ছ করা কি মানায়? যেসব তরুণ তুর্কি, জুনিয়র ডাক্তার এবং সংগঠন নিজেদের ক্যারিয়ার বা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রথম দিন থেকে বিচার চেয়ে রাস্তায় লড়লেন, তাঁদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা কেবল অকৃতজ্ঞতা নয়, বরং এক বিশাল গণআন্দোলনের মুখে চপেটাঘাত।
​যখন আন্দোলনের ‘মুখ’ হিসেবে পরিচিতরা রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন এবং লড়াইয়ের সহযোদ্ধাদেরই অপমান করেন, তখন বিচার পাওয়ার আশা ফিকে হতে শুরু করে। এটি কেবল একটি পরিবারের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর গড়ে ওঠা জনগণের ঐক্যকে কীভাবে স্বার্থান্বেষী মহল গ্রাস করে নিতে পারে।

শেষের কথা 
​আরজিকর কাণ্ড আমাদের শিখিয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে একজোট হতে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আন্দোলনের উত্তাপকে ভোটের বাক্সে রূপান্তর করার এই প্রবণতা আসলে ন্যায়বিচারের আদর্শকেই পরাজিত করে। ইতিহাসের কাছে এই প্রশ্ন আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—রক্তের বিনিময়ে কি কেবল ক্ষমতার আসনই পাকা হবে? নাকি জনগণের এই নিঃস্বার্থ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত তার নৈতিক জয় ছিনিয়ে আনতে পারবে? সময় এর উত্তর দেবে, তবে আপাতত সাধারণ মানুষের মনে বিষণ্ণতা আর এক বুক হাহাকার ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *