বঙ্গে ১ম দফার নির্বাচনে পড়লো রেকর্ড ভোট, ঊর্ধ্বমুখী ভোটদানের হার কি পরিবর্তনের ইঙ্গিত?
চলতি নির্বাচনের প্রথম দফায় ভোটদানের হার আগের সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে গিয়েছে। নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সাধারণের বেনজির উৎসাহ কার পক্ষে গেলো কিংবা আগামী ২৯ শে এপ্রিলই বা শহরাঞ্চলে ভোটদানের হার কত থাকে সেটাই এখন দেখার। আপাতত, রেকর্ড ভোট কোন দিকে যেতে পারে তা নিয়ে কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলির অন্দরে চলছে জোর জল্পনা।
আদৃতা মজুমদার: বিক্ষিপ্ত অশান্তি বাদ দিয়ে মোটের ওপর শান্তিপূর্ণভাবেই মিটেছে বঙ্গের প্রথম দফার নির্বাচন (Election 2026)। আর সেই নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যা ছুঁয়েছে ভোটদানের হার। কমিশনের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সন্ধ্যে ৬ টা পর্যন্ত রাজ্যের যে ১৫২ টি আসনে ভোটগ্রহণ ছিল সেখানে গড়ে প্রায় ৯৩ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পড়েছে। ভোটদানের নিরিখে শীর্ষে রয়েছে দক্ষিণ দিনাজপুর। এবার প্রশ্ন হলো এত বিপুল সংখ্যক ভোট যে পড়লো তার কি কোনো বিশেষ ইঙ্গিত রয়েছে ? গণতন্ত্রের উৎসবে সাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কি রাজ্যের বিদায়ী শাসক শিবিরের জন্য বিপজ্জনক আর বিরোধী শিবিরের জন্য আশাব্যঞ্জক, নাকি উল্টোটা ? বিগত বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাস ঘাঁটলে বেশ কয়েকটি তথ্য পাওয়া যায়। ১৯৫১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। জাতীয় কংগ্রেস দলের টিকিটে জিতে তৎকালীন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন ডঃ বিধানচন্দ্র রায়।সেই সময় ভোটদানের হার ছিল ৪২.২৩ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ভোটারের অর্ধেকও নয়। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মসনদে এসেছে পরিবর্তন। বেড়েছে ভোটদানের হারও। আর তার মাঝেই রাজ্যের রাজনীতিতে ঘটে পালাবদলও। ১৯৬৪ সালে সিপিআই ভেঙে দুটি দল গঠিত হয়। একটি সিপিআই (CPI) এবং আরেকটি সিপিআইএম (CPIM)। তবে দল ভাঙলেও মনোবল ভাঙেনি সিপিআইএম কর্মীদের। ১৯৭৭ সালে লাল ঝড় তুলে রাজ্যে ক্ষমতায় আসে সিপিআইএম। আর সেই পরিবর্তনের সময় রাজ্যের ২৯৪ টি আসনে গড়ে ভোট পড়ে ৫৬.১৫ শতাংশ। এরপর থেকে টানা ৩৪ বছর ছিল বামেদের আধিপত্য। ২০১১ সালে আবারো একটা পালাবদলের সাক্ষী পশ্চিমবঙ্গ। সিপিআইএমকে দুরমুশ করে রাজ্যে সরকার গঠন করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দল তৃণমল (TMC)। সেবার ভোটদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।প্রতিটি বিধানসভা আসনে গড়ে ৮৪.৩৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এবার আরও একটা বিধানসভা নির্বাচন। সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে সেই নির্বাচনের প্রথম দফা। আর তাতেই রেকর্ড ভোট পড়েছে ১৫২ টি কেন্দ্রে।
এই তথ্যগুলি শুধুমাত্র নিগূঢ় পরিসংখ্যান নয়, বরং বেশি সংখ্যক ভোটদানের হারের নানান ব্যাখ্যার নির্দেশকও বটে। প্রথমেই ভোট দানের উচ্চ্ হারের কারণ বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। আর সেই বিশ্লেষণ বলছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির বুথস্তরভিত্তিক মজবুত সংগঠন, ভোটারদের উৎসাহ এবং এসআইআর (SIR) – এই তিনটি সম্ভাব্য কারণ প্রায় ৯৩ শতাংশ ভোটদানের হারের পিছনে থাকতে পারে। উল্লেখ্য, ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় শেষবারের মতো ইনটেনসিভ রিভিশন হয়। তারপর আবার ২০২৫ সালে শুরু হয় সেই প্রক্রিয়া। সুতরাং এবারের ভোট হচ্ছে ‘ঝাড়াই-বাছাই’ করা ভোটার লিস্ট অনুযায়ী। তাই ভোট না দিলে যদি তালিকা থেকে নাম বাদ যায় সেই ভিত্তিহীন আশঙ্কা থেকেও অনেকেই গরমের দাবদাহ উপেক্ষা করে ভোট দিয়েছেন।
এবার যদি ঊর্ধ্বমুখী ভোটের হারের ব্যাখ্যা করা হয় তাহলে সেটি দুইভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। এক, বেশি সংখ্যক ভোটের হার পরিবর্তনের পক্ষে মানুষের রায়, দুই, বিদায়ী শাসক দলকে আরও পাঁচ বছরের জন্য সুযোগ দিতে সাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। সবমিলিয়ে চলতি নির্বাচনের প্রথম দফায় ভোটদানের হার আগের সব রেকর্ডকে ছাপিয়ে গিয়েছে। নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সাধারণের বেনজির উৎসাহ কার পক্ষে গেলো কিংবা আগামী ২৯ শে এপ্রিলই বা শহরাঞ্চলে ভোটদানের হার কত থাকে সেটাই এখন দেখার। আপাতত, রেকর্ড ভোট কোন দিকে যেতে পারে তা নিয়ে কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলির অন্দরে চলছে জোর জল্পনা। রেকর্ড ভোটদানের হার কি রাজনৈতিক পালাবদল ঘটাবে ? নাকি বদলাবে ভোটের অঙ্ক? কোন দিকে আসবে পরিবর্তন ? উত্তর মিলবে ৪ ঠা মে।



