সম্পাদকীয়

এবার ভোটে নতুন সংযোজন “ভোটের গান”, পানিহাটির কলতানকে পিছনে ফেললো ভাঙড়ের “মাছ চোর”

শুধু ভাঙড় নয়, রাজ্য জুড়ে কার্যত মুখে মুখে ফিরছে "মাছ চোর"। চলতি নির্বাচনে এই একটি বিষয়ে বিরোধীদের টেক্কা দিয়েছে বামেরা। তবে ভয় হয়, ভবিষ্যতে ভোটের গান বলে রাজনীতি বাদ দিয়ে কুৎসিত, ব্যাক্তিগত কুৎসা, শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে কিছু না হয়।

মৃত্তিকা সেনগুপ্ত : বাঙালির যে কোনও উৎসবের অন্যতম অনুসঙ্গ হলো গান। একটু যারা প্রাচীন মানুষ, মানে গ্রামাফোন রেকর্ড বা তারপরে টেপরেকর্ডারের আমলের লোক, তাদের কাছে পুজোর গান ছিলো একটা বিশেষ চাহিদার বিষয়। পুজো সংখ্যা বইয়ের সাথে মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার,আশা ভোঁসলে,সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সহ অন্যান্য শিল্পীরা পুজোয় কি গান গাইছেন তা নিয়ে ছিল বিপুল উৎসাহ। “জড়োয়ার ঝুমকো থেকে একটা মতি খসে পড়েছে” বা “কিনে দে রেশমী চুড়ি”, “আমার পূজার ফুল, ভালোবাসা হয়ে গেলো” গানগুলিকে ভোলার উপায় আছে বাঙালীর ? এছাড়াও বাংলার বিভিন্ন লোকউৎসব উপলক্ষে গান বেঁধেছেন লোকশিল্পীরা। গাজনের গান, ময়মনসিংহ গীতিকা, বা ধরুন বিভিন্ন পাঁচালি। সবটাইতো বাঙালীর বিভিন্ন উৎসবকেই সামনে নিয়ে আসে। আসলে বাংলার এই সুজলা মাটি সুরে ভেসে যেতে অভ্যস্ত। সেটা অনন্দেও হতে পারে আবার বিরহে বা দুঃখেও। বাঙালীর গান চাই। আমাদের দুই প্রিয় মানুষকে ভাবুন, তাঁরা পুত্র শোকে রচনা করছেন “শুন্য এ বুকে পাখি মোর আয়” অথবা “আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে”। আবার দুর্ভিক্ষ পীড়িত বাংলায় ঝলসে উঠলো সলিল চৌধুরীর কলম। তেভাগা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে লেখা হলো “হেই সমালো ধান হো, কাস্তেটা দাও শান গো” র মত গান। মুক্তিযুদ্ধের গান হয়ে উঠলো “মাগো ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তি প্রিয় শান্ত ছেলে”। প্রতিদিনের যাপনের দুঃখ, ভালোবাসা গানে গানে ফুটিয়ে তুললেন সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, নরেন মুখার্জী থেকে শুরু করে পুলক বন্দোপাধ্যায়,সুধীন দাশগুপ্ত, কমল দাশগুপ্ত সহ আরও অনেকে। তারপর এলো সুমন নচিকেতার যুগ, “ভীষণ অসম্ভবে তোমাকে চাই” যেন চমকে দিলো বাঙালী সংগীতকে, যার সঙ্গে যুক্ত হলো “দেখে যা, যা অনির্বান” বা “রঞ্জনা আমি আর আসবো না”। আমাদের প্রতিদিনের চাওয়া, না পাওয়া, কষ্ট, অভিমান যেন ছিটকে বার হয়ে এলো সুমন, নচিকেতা, অঞ্জনের গলায়। কিন্তু ভোট নিয়ে প্রার্থী ধরে ধরে গান ? না এমনটা ছিল বলে মনে করতে পারছেন না বাংলা সংগীত প্রেমীরা। ভোটের গান হয়েছে, দা`ঠাকুরের আমলেই হয়েছে। কিন্তু সেগুলো ছিলো নিতান্তই “রম্য গীতি”। কিন্তু ২০২৬এর বিধানসভা নির্বাচনে যে ভাবে বাম প্রার্থীদের সমর্থনে তাদের কর্মী সমর্থকেরা গান বাঁধলেন, গাইলেন, নাচলেন, যা এক কথায় অভূতপূর্ব। শুরুটা বোধহয় হয়েছিল পানিহাটী থেকে। পানিহাটীর সিপিআইএম প্রার্থী কলতান দাশগুপ্তের সমর্থনে “বদলে দিতে, হিসেব নিতে, আসছে এবার লাল” গানটি প্রকাশ হতেই তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। তারপর বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে সায়নদীপ, বলতে গেলে ২৯৪টি আসনের যে কোটি আসনে সিপিআইএম লড়াই করেছে, তার প্রত্যেকটির জন্য আলাদা আলাদা গান তৈরী করেছে দলের কর্মী সমর্থকেরা। তবে জনপ্রিয়তায় সবকটি গানকে ছাপিয়ে গেছে ভাঙড়ের তৃণমূল প্রার্থী শওকত মোল্লার বিরুদ্ধে লেখা “মাছ চোর” গানটি। শুধু ভাঙড় নয়, রাজ্য জুড়ে কার্যত মুখে মুখে ফিরছে “মাছ চোর”। চলতি নির্বাচনে এই একটি বিষয়ে বিরোধীদের টেক্কা দিয়েছে বামেরা। তবে ভয় হয়, ভবিষ্যতে ভোটের গান বলে রাজনীতি বাদ দিয়ে কুৎসিত, ব্যাক্তিগত কুৎসা, শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে কিছু না হয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *