সম্পাদকীয়

“রাজার হলো খুব অসুখ”- ভোটে ভরাডুবি TMC’র, কী ‘অসুখ’ করলো তাদের ?

গত মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠক করে তৃণমূলের দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন- তারা হারেননি, বরং তাঁর দাবি, কমিশনের সাহায্যে ১০০ টির বেশী আসন লুট করা হয়েছে। তবে তৃণমূল নেত্রীর তরফে যেমন উঠছে 'কারচুপির' অভিযোগ তেমনি তৃণমূলের পতনের নেপথ্যে আরও বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

আদৃতা মজুমদার : “রাজার হলো খুব অসুখ/জ্বললো বাড়ি, ভাঙলো বুক”- গতকালের নির্বাচনের ফলাফল দেখে যে তৃণমূল প্রার্থীদের মন ভেঙেছে তা বলাই বাহুল্য। গোটা রাজ্যজুড়েই ভরাডুবি হয়েছে ঘাসফুল শিবিরের। বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে ২০৭ টি আসন, আর রাজ্যের প্রাক্তন শাসক শিবির ১০০ ছোঁয়নি। ৮০ আসনেই থেমেছে তারা। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলার মসনদে এসেছে বিজেপি। আগামী ৫ বছর বঙ্গের রাশ তাদের হাতেই। তবে এখন প্রশ্ন হলো রাজার থুড়ি ‘রানীর’ কি ‘অসুখ’ করলো ? অর্থাৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) রণনীতি যে কাজে আসেনি ভোটের ময়দানে তা নির্বাচনের ফলেই স্পষ্ট। কিন্তু কেন কাজে এলো না সেই কৌশল ? একের পর এক হেভিওয়েট তৃণমূল(TMC) প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণ চলছে দলের অন্দরে। রাজ্যজুড়ে কিছুদিন আগেও যে দলের ‘দাপট’ ছিল সর্বাধিক, সেই দলের থেকে ‘মা-মাটি-মানুষের’ মুখ ফেরানোর কারণ হিসেবে উঠে আসছে একাধিক তত্ত্ব। গত মঙ্গলবার সাংবাদিক বৈঠক করে তৃণমূলের দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন- তারা হারেননি, বরং তাঁর দাবি, কমিশনের সাহায্যে ১০০ টির বেশী আসন লুট করা হয়েছে। তবে তৃণমূল নেত্রীর তরফে যেমন উঠছে ‘কারচুপির’ অভিযোগ তেমনি তৃণমূলের পতনের নেপথ্যে আরও বেশ কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
চাকরির বদলে ভাতা রাজনীতি:
ফেব্রুয়ারি মাসের অন্তর্বর্তী বাজেটে তৎকালীন রাজ্য সরকারের তরফে প্রথম যুবসাথী প্রকল্পের কথা ঘোষণা করা হয়। ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় সেই প্রকল্পের আবেদন প্রক্রিয়া। মাসিক ১৫০০ টাকা ভাতা পেতে রাজ্যের দিকে দিকে নির্দিষ্ট ক্যাম্পের বাইরে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি প্রাপ্ত যুবক-যুবতীরাও। যুবসাথী প্রকল্পে সাধারণের সাড়া দেখে যখন তৃণমূল নেতৃত্ব কার্যত আপ্লুত, তখন সমাজমাধ্যমের পাতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের এ হেন উদ্যোগের বিরুদ্ধে বেকারত্ব নিয়ে সরব হচ্ছিলেন অনেকেই। চাকরির বদলে ভাতা প্রদান কি তবে বাংলার মানুষের কাছে খুব বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায়নি? ভোটের ফল দেখলেই উঠছে সেই প্রশ্ন।
চাকরি-দুর্নীতি:
২০২৫ সালের এপ্রিল মাস।২০১৬ সালের এসএসসির (SSC) নিয়োগ প্রক্রিয়া বেলাগাম দুর্নীতির শিকার হতে হয় বহু শিক্ষকদের। সুপ্রিম নির্দেশে বাতিল হয় ২৬ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের চাকরি। উল্লেখ্য, প্রথমে হাইকোর্টও একই রায় দিয়েছিলো। নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে স্কুল সার্ভিস কমিশনের ২০১৬’র পুরো প্যানেলই বাতিল হয়ে যায়। রাতারাতি দিশেহারা হয়ে পড়েন বহু যোগ্য শিক্ষকেরা। আর এই শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে ২০২২ সালে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডির হাতে গ্রেপ্তার হন রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়। ফলত, খানিক স্বাভাবিকভাবেই ২০২৫’র এপিল মাসের ঘটনায় রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিতে থাকেন চাকরিহারা শিক্ষকেরা।সেই ক্ষোভের আঁচ যে ভোটবাক্সেও পড়েনি তা কিন্তু হলফ করে বলা যায় না।
মহিলা ভোটব্যাংকে ফাটল?
পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক হলেন মহিলারা। তাই তাদের ‘তুষ্ট’ রাখতে বরাবরই তৎপর ছিলো তৃণমূল। কন্যাশ্রী থেকে রূপশ্রী, শেষে লক্ষ্মীর ভান্ডার- এই সব প্রকল্পই সেই তৎপরতার এক একটি মাধ্যম। তবে ক্ষমতায় এলে মহিলাদের মাসিক ৩০০০ টাকা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় বিজেপি। তবে কি এবারও খয়রাতির রাজনীতির জয়জয়কার ? নাকি আরজিকর কান্ডের জেরে ‘ব্যাকফুটে’ ঘাসফুল শিবির? প্রসঙ্গত, এবারের নির্বাচনে আরজিকর কান্ডের নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথকে পানিহাটী থেকে প্রার্থী করে বিজেপি। তাঁর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা শক্তিশালী প্রার্থীদের হারিয়ে জিতেওছেন রাজনীতির ময়দানে নবাগতা অভয়ার মা। যদিও সেই জয় নাকি ‘অভয়া আবেগ’রই প্রতিফলন। এমনটাই মত বহু বিরোধীদের।
মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে ‘হুমায়ুন’হানা:
নওদা ও রেজিনগর- ২০২১’র নির্বাচনে দুটি আসনেই জিতেছিল তৃণমূল। রাজ্যের প্রাক্তন শাসক শিবির যে বরাবরই মুসলিম ভোটে ‘পুষ্ট’ তা বলাই বাহুল্য। তবে এবার সেই ভোটেও যে ফাটল ধরেছে তা ভোটের ফলেই একপ্রকার স্পষ্ট। মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু অধুষ্যিত এই দুটি আসনেই এবার জিতেছেন হুমাযুন কবীর। তাঁর নতুন দল ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’র পক্ষেই গিয়েছে সেখানকার মানুষের ভোট।তাই এই দিকেও এবার ‘বিশেষ সুবিধা’ হয়নি তৃণমূলের বলেই মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের।
অন্যান্য কারণ:
এসআইআর নিয়ে রাজ্যে জলঘোলা কম হয়নি। শাসক দলের তরফে বারংবার নিশানা করা হয়েছে নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপিকে। একদিকে বৈধ ভোটারদের অযথা হয়রানির অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয় সরকারকে একহাত নিয়েছেন তৃণমূল। অন্যদিকে বিজেপিও সরব ছিল ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুতে। তবে তৃণমূলের ‘ন্যারেটিভ’ যে খুব একটা কার্যকরী হয়নি তা বলাই বাহুল্য। এমনকি বিরোধীদের দাবি, মৃত ভোটারদের ‘সৌজন্যে’ ভোটবাক্সে নিজেদের সুবিধা করে তৃণমূল। তবে এসআইআরের ফলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন মৃত ভোটাররা। আর একই সঙ্গে রাজ্যজুড়ে ‘ভরাডুবি’ হলো ঘাসফুল শিবিরের। বিরোধীদের দাবির বাস্তবতা খানিকটা হলেও সত্যি বলে মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের। সেই সঙ্গে হারের পর দলেরই একাধিক নেতা নিশানা করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। গোষ্ঠীকোন্দল নিয়েও মুখ খুলেছেন বিদায়ী বিধায়ক। এমনকি রেশন দুর্নীতি কান্ডে জেলে যাওয়া জ্যোতিপ্রিয় মল্লিককে প্রার্থী করাও নাকি ‘ভুল’ ছিল- এমনই মত দলের একাংশের। সবমিলিয়ে তৃণমূলের পরাজয়ের নেপথ্য কারণ হিসেবে উঠে আসছে নানা মুনির থুড়ি নেতার নানা মত।দিনের শেষে সত্যিটা হলো – ‘রাজার মুকুট,রাজার সাজ/অন্য কেউ তা পরবে আজ।’ পদ্ম শিবিরের (BJP) শাসনকালে কেমন থাকে বাংলার পরিস্থিতি ? সবটাই জানা যাবে সঠিক সময়ে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *