১৪ বছর পর খুলল বরুণ বিশ্বাস হত্যা মামলার ফাইল, ফের তদন্তে সিআইডি
সুটিয়ার প্রতিবাদী শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডে নতুন করে তদন্তে নেমেছে সিআইডি। পরিবারের অভিযোগ, আগের তদন্তে প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করা হয়েছিল। গোবরডাঙার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেন তদন্তকারীরা
নিজস্ব সংবাদদাতা : দীর্ঘ ১৪ বছর পর উত্তর ২৪ পরগনার সুটিয়া গণধর্ষণকাণ্ডের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী এবং শিক্ষক বরুণ বিশ্বাসের হত্যাকাণ্ডের মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করা হয়েছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিশেষ নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সুঁটিয়ার এই প্রতিবাদী শিক্ষক খুন হওয়ার মামলার নতুন করে তদন্ত শুরু হতে চলেছে। রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সরকার পরিবর্তনের পর বরুণ বিশ্বাসের পরিবারের পক্ষ থেকে এই মামলার পুনর্তদন্ত করার জন্য আবেদন জানানো হয়েছিল। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে গত শনিবার জনতা দরবারে কর্মসূচিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে নিহত শিক্ষকের পরিবারের সদস্যরা নিজেদের আবেদনের কথা জানান। পরিবারের পক্ষ থেকে তখনই জানানো হয়েছিল যে , মামলার পুনঃতদন্ত করার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আর সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেই শেষ পর্যন্ত খুললো ১৪ বছর আগে ঘটে যাওয়া এক প্রতিবাদী শিক্ষক বরুন বিশ্বাস হত্যাকাণ্ডের ধুলোপড়া ফাইল।
২০১২ সালের ৫ জুলাই উত্তর ২৪ পরগনার গোবরডাঙা স্টেশনের কাছে দুষ্কৃতীদের অতর্কিত গুলিতে প্রাণ হারান কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের (মেন) বাংলার শিক্ষক বরুণ বিশ্বাস। সেই সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ এবং বিভিন্ন অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণেই তাঁকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যার করা হয়েছিল বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছিল। মাত্র ৩৮ বছর বয়সী এই শিক্ষক সুটিয়ায় সংঘটিত নারী নির্যাতন এবং গণধর্ষণের মতো জঘন্য ঘটনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এর ফলে তিনি ওই এলাকায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক প্রতিবাদের মুখ হয়ে উঠেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি এলাকার নানা দুর্নীতির বিরুদ্ধেও সাহসের সাথে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। বরুণ বিশ্বাসের এই মর্মান্তিক মৃত্যু সমগ্র রাজ্যজুড়ে এক প্রবল আলোড়ন ও শোকের ছায়া তৈরি করেছিল। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুর প্রতিবাদে শিক্ষক সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছিলেন, দাবি উঠেছিল সঠিক দোষীদের চিহ্নিত করে কঠোরতম শাস্তির। আর এই প্রসঙ্গেই বারংবার উঠে এসেছিলো একাধিক তৃণমূল নেতার নাম, জড়িয়েছিল তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের নামও। খুনের দিন থেকে আজ অবধি মৃত শিক্ষক বরুন বিশ্বাস পরিবার তরফে বারংবার অভিযোগ তোলা হয়েছে জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকের বিরুদ্ধে, দাবি করা হয়েছে বরুন হত্যার নেপথ্যে রয়েছেন বালু-ই। পরিবারের অভিযোগ, তৃণমূল জামানায় দায়সারা তদন্ত করে, আসল হত্যাকারীদের বাঁচিয়ে নিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল তদন্ত, বারংবার পুনর্তদন্তের দাবি তুললেও সেই দাবিতে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছিলো তৎকালীন মমতা সরকার। তারপর থেকে আলোর মুখ দেখেনি বরুন বিশ্বাস হত্যার ফাইল, হয়নি কোনও বিচার, প্রতিবাদী ভাইয়ের ছবি বুকে আঁকড়ে বসে সুবিচারের আশায় দিন গুনেছেন বরুনের দিদি।
শেষ আশা নিয়ে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরেই বরুন বিশ্বাস হত্যা মামলার ফাইল খোলার দাবি রাখতেই ১৪ বছর পর ফের শুরু হলো সুঁটিয়ার প্রতিবাদী শিক্ষক বরুন হত্যার পুনর্তদন্ত। সেই তদন্তের অংশ হিসেবে এদিন সিআইডির একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল বরুণ বিশ্বাসের গোবরডাঙার বাড়িতে উপস্থিত হয়। সিআইডির প্রতিনিধি দলের দুই জন আধিকারিক বরুণ বিশ্বাসের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বাবা এবং দিদিসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বিস্তারিত আলাপচারিতা করেন। তদন্তকারী দল বরুণ বিশ্বাসের জীবনযাত্রা, তাঁর সামাজিক ভূমিকা, বর্তমান এলাকার সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং ঠিক কী কী কারণে তাঁকে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়েছিল, সেই সংক্রান্ত সমস্ত বিষয় নিয়ে অত্যন্ত গভীরে গিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। পাশাপাশি, এলাকায় নারীদের ওপর চলা অত্যাচার এবং বিভিন্ন সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বরুণ বিশ্বাসের সক্রিয় প্রতিবাদী অবস্থান সম্পর্কেও খোঁজখবর করেন। পরিবারের সন্দেহে ,এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সম্ভাব্য অভিযুক্ত করা হতে পারেন সেই বিষয়েও দৃষ্টিপাত করেন অফিসারেরা।


