সমস্ত বারুদ মজুত সত্ত্বেও কি ভাবে সম্ভব হলো ৫দশকে ১ম বার রক্তপাতহীন ৯২%`র ভোট ?
এবারে প্রায় রক্তপাতহীন নির্বাচন করানোর জন্য যে ভাবে কমিশন এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় থেকে ধীরে ধীরে রাজ্যের প্রশাসনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বাড়ানো শুরু করেছিল এবং ভোট ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ-প্রশাসনে অভূতপূর্ব রদবদল ঘটিয়ে গোটা ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দিয়েছিল, যেটাকে আমরা অনেকেই কমিশনের "তুঘলকী" সিদ্ধান্ত বলছিলাম, আসলে তারই সুফল এই অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।
চন্দন সেনগুপ্ত : রাজ্যে এমন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন শেষ কবে দেখেছেন, মনে করতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছেন রাজ্যবাসী। আর ভোটদানের হার তো সর্বকালীন রেকর্ড তৈরী করে দিলো এই SIR আবহে। পশ্চিমবঙ্গে ১ম বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল ১৯৫১ সালে, ভোটদানের হার ছিল ৪৩.১২ শতাংশ। বাংলার বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক বিষশ্লেষকেরা জানাচ্ছেন ১৯৭১ সালে নাকি এমন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছিল, তবে রক্তপাত বা প্রাণহানির ঘটনা যদি মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়, তা হলে ১৯৭১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এ বারের নির্বাচনের চাইতে অনেকটাই পিছিয়েই থাকবে। নকশাল জমানার শেষ দিকে হওয়া সে নির্বাচনে বহু মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ভোটে অংশ নিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু সে বারের নির্বাচনে চার জন প্রার্থী খুন হয়ে গিয়েছিলেন। ভোটদানের হারও ছিলো ৬২.০৩ শতাংশ। এরপর যে বারের ভোটকে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয় সেটা মাত্র ১৫ বছর আগের ঘটনা, ২০১১, পঞ্চদশ বিধানসভা নির্বাচন, যে নির্বাচনে বামফ্রন্টকে বানপ্রস্থে পাঠিয়েছিল বাংলার মানুষ তৃণমূলকে ক্ষমতায় নিয়ে এসে। ২০১১তেও উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে ছিলো ভোটদানের হার, ৮৪.৭২ শতাংশ, যা এতদিন সর্বাধিক ছিলো। কিন্তু SIR আবহে যখন রাজ্য ও কেন্দ্রের দুই শাসক দল ভোটার বহু আগে থেকেই যুযুধান ছিলো, বিভিন্ন ইস্যুতে রাজ্যের পরিবেশ ছিল তপ্ত কড়াইয়ের মতো উত্তপ্ত, ঠিক সে সময়ে ২ দফায় ভোট করে নির্বাচন সদন যে অভূতপূর্ব সাফল্য লাভ করলো তার জন্য কমিশনের যেমন ধন্যবাদ প্রাপ্য, ঠিক তেমন ভাবেই এর কৃতিত্ত্ব রাজ্যের সাধারণ মানুষের সাথে সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলিরও। দুই দফাতেই সকাল থেকে ভোট গ্রহণ কেন্দ্রগুলির বাইরে দেখা গেছে এমন বিশাল লাইন, মানুষ কিন্তু ধৈর্য হারান নি। পাশাপাশি কমিশন নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনের তৎপরতায় কোথাও কোন বড় মাপের হাঙ্গামা হয় নি, হতাশ হয়েছে সংবাদ মাধ্যম সহ অনেকেই। অথচ পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে ২৪ জনের প্রাণ গিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। তার পাঁচ বছর আগে ২০১৬ সালে সাত জন নির্বাচনী হিংসার বলি হয়েছিলেন। এ বার সে সংখ্যা শূন্য। ভোটের দিন কোথাও কোনও বোমাবাজির ঘটনাও ঘটেনি। অথচ মাত্র পাঁচ বছর আগের ভোটে ৬০টিরও বেশি বোমাবাজির ঘটনা ঘটেছিল।
আমরাও সকাল থেকে আপনাদের সামনে তুলে ধরেছি লম্বা লাইনের ছবি, বিভিন্ন দলের প্রার্থীরাও বুথে বুথে ঘুরেছেন, কিন্তু কোনো অভিযোগ করার সুযোগ পান নি। আসলে এবারে প্রায় রক্তপাতহীন নির্বাচন করানোর জন্য যে ভাবে কমিশন এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় থেকে ধীরে ধীরে রাজ্যের প্রশাসনে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বাড়ানো শুরু করেছিল এবং ভোট ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ-প্রশাসনে অভূতপূর্ব রদবদল ঘটিয়ে গোটা ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দিয়েছিল, যেটাকে আমরা অনেকেই কমিশনের “তুঘলকী” সিদ্ধান্ত বলছিলাম, আসলে তারই সুফল এই অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।



